বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প
ভূমিকা
নদীবিধৌত ও পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ, সৃষ্টিকর্তার অপরূপ শিল্পের সেরা প্রদর্শনী আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু হয়ে সবুজের গালিচায় আঁকা বাংলাদেশের নামের চিত্রকথাটি শেষ হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছেন,
হিমালয় থেকে সুন্দরবন,
হঠাৎ বাংলাদেশ
কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে…
দিগন্তজুড়ে সবুজের পটভূমি, বাংলার ভূখণ্ডের বুক চিরে ছুটে চলা অসংখ্য ছোটবড় নদী, পূর্ব সীমান্তের পাহাড়ের সৌন্দর্য, দক্ষিণের ম্যানগ্রোভ বন ও সমুদ্র সৈকত, দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থানসমূহ ও হাজার বছরের ইতিহাসের বাহক পুরাকীর্তি দেশী বিদেশী পর্যটকদের বিমোহিত ও বিস্মিত করে।
পর্যটন ও পর্যটন শিল্পের ধারণা
পর্যটন হলো এক ধরনের বিনোদন। অবসর যাপন অথবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কিংবা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ করাকে পর্যটন বলে। ভ্রমণের সময় প্রয়োজন হয় পরিবহন ব্যবস্থা, থাকার জন্য আবাসন, খাবার জন্য রেঁস্তোরা, কেনাকাটার জন্য দোকান এবং এই সমস্ত ব্যবস্থাপনা যে শিল্প গড়ে উঠে তাকে বলা হয় পর্যটন শিল্প। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই পর্যটনের ধারা চলে আসছে। মানুষ দেশ বিদেশ ভ্রমণ উপভোগ করতে ছুটে চলেছেন পুণ্যস্থান, মেলা, পানি দিয়ে গড়া অনুপম সৌন্দর্য। তাদের একান্ত কল্পনার আকর্ষণ করেছে আমেরিকা মহাদেশের নানা প্রাণীর কাল থেকে শুরু করে সৌন্দর্য ও শিল্পের জন্য বিখ্যাত পিরামিড গিজা। তাইতো বাংলার রূপসী চানে ময়মনসিংহের মহুয়া বধূ, ডিঙ্গিভরা সাঁকো এর মত বিবিধ পরিবেশের গান এ দেশে পর্যটন এনেছিল।
পর্যটন শিল্পের মূল উপাদানগুলো
পর্যটন শিল্পের অন্যতম উপাদানগুলি হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ধর্মীয় স্থান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পৌরাণিক ইতিহাস ইত্যাদি যা পর্যটকদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়াও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন, চিত্তবিনোদনের মূল্যবান উপকরণ এর সমষ্টি এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পর্যটনকে অনেক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবান করে তোলে। এইসবই পর্যটকদের কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠে।
ভ্রমণ সম্পর্কে জেমি লিন বলেছিলেন,
‘‘ চাকরি আপনার পকেট ভরে কিন্তু ভ্রমণ আপনার আত্মা পূর্ণ করে।”
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের রূপ
কবির কলমে বাংলার রূপ,
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সেজে আমার জন্মভূমি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার ভাণ্ডারের এই বাংলাদেশে নানা সময়ে নানা রূপের দেখা মিলে। দেশি বিদেশি ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের আকর্ষণ করার মতো অসংখ্য প্রাকৃতিক আকর্ষণ রয়েছে:
১) প্রাকৃতিক পর্যটন: পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক মায়ার ভাণ্ডার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, কুয়াকাটার সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, সিলেটের জাফলং, শ্রীমঙ্গলের চা বাগান, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, মহাস্থানগড়, পাহাড়ি ঝর্ণাধারা, বান্দরবানের নীলগিরি, সাজেক ভ্যালি, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, টাঙ্গুয়ার হাওর ইত্যাদি। এসব জায়গা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অমূল্য সম্পদ।
২) ঐতিহাসিক পর্যটন: দেশের ইতিহাস বহনকারী বহু স্থাপনা রয়েছে। যেমনঃ মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ময়মনসিংহ ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাস্কর্য, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ষাট গম্বুজ মসজিদ, মসজিদ নগর, ময়মনসিংহের শশী লজ, মুঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন, বঙ্গভবন ইত্যাদি।
৩) সাংস্কৃতিক পর্যটন: দেশের ভেতরে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, সোনারগাঁয়ের লোকজ শিল্পকলা, বৈশাখী মেলা, লোকসঙ্গীত, নাট্যশিল্প, চারুকলা, আধুনিক চিত্রশিল্প, নৃত্যকলা, বাউল সংগীত ও ভাওয়াইয়া, আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি—এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পর্যটকদের মনে বিশেষভাবে দাগ কাটে।
৪) গ্রামীণ পর্যটন: বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারী মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রা, কৃষিকাজ, মাছ ধরা, তাঁত শিল্প, হাট-বাজার, উৎসব, অতিথি আপ্যায়ন ইত্যাদি বিদেশি পর্যটকদের কাছে অনেক আকর্ষণীয় মনে হয়। এ গ্রামীণ সৌন্দর্য ভ্রমণকারীদের কাছে এক অমূল্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
৫) ধর্মীয় ভ্রমণ: বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের অনেক তীর্থ রয়েছে যাদের মধ্যে অন্যতম ভ্রমণ গন্তব্য কাপ্তাইয়ের মসজিদ, চট্টগ্রাম পাহাড়তলী, দূর্গাপূজার মহালয়া, কিশোর রামু বিহার ও বৌদ্ধ বিহারের সমূহ। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের অনেক সূফী সাধক মাজার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুরো বাংলাদেশে, যেমন শাহজালালের মাজার, শাহপরানের মাজার, মাটির গম্বুজ মসজিদ ও বিভিন্ন ওরস শরীফ সমূহ। প্রতিবারই বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান এদেশে হাজার হাজার ভক্ত ধর্মাবলম্বীর আগমন ঘটে।
৬) নৌ বিহার: বাংলাদেশ দেশের খালবিল রাজ্যের কারণে নৌপর্যটনের জন্য দেশ বিদেশের পর্যটকদের কাছে সুপরিচিত। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেটের হাওর এবং সুন্দরবনের নৌবিহার বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব
সারা পৃথিবীব্যাপী পর্যটন শিল্প এখন একটি সেবা শিল্প। উন্নয়নশীল খাত। ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যে পর্যটন গন্তব্য সম্পর্কিত ছবি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে পৌঁছে যায়, এবং উচ্চতর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য সহজ করে দিয়েছে দেশ ভ্রমণকে। বিশ্বের নানা প্রান্তে ভ্রমণ শিল্প আয় করে চলেছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি পর্যটক পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভ্রমণ করে থাকে। এর ফলে পৃথিবীর মোট আয়ের ১২% আসে পর্যটন শিল্প থেকে। বাংলাদেশেও এ শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। ফলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে পর্যটন শিল্প ভূমিকা পালন করে আসছে।
পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব সংক্ষেপে
১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন: পর্যটন শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও টাকার ব্যবহারযোগ্যতার সুযোগ সৃষ্টি করে, ফলে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
২. কর্মসংস্থান সৃষ্টি: পর্যটন শিল্পে পরিবহন, আবাসন, রেস্তোরাঁ, পানশালা, দোকান, পর্যটন সংশ্লিষ্ট শিল্পে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ নিয়োজিত থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
৩. অবকাঠামো উন্নয়ন: পর্যটন নির্ভর এলাকায় নতুন অবকাঠামো, যেমন রাস্তা, বিমানবন্দর এবং আবাসন ব্যবস্থা উন্নত হয়, যা ঐ এলাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়।
৪. সাংস্কৃতিক বিনিময়: পর্যটক এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটে, যা বিভিন্ন দেশের মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে।
৫. দারিদ্র্য বিমোচন: পর্যটন শিল্প প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং অনগ্রসর এলাকায় মানুষের চাকরির সুযোগ এনে দেয়, যার ফলে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নত হয় এবং দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের অবদান
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য খাত। এ শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে পর্যটন খাত থেকে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পর্যটন শিল্পের অবদান
বিদেশি পর্যটকদের আগমন-সংক্রান্ত নানা খরচ ও বিভিন্ন ব্যয় থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয়। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৪ লাখ ৬১ হাজার বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নে পর্যটন শিল্পের অবদান
পর্যটন শিল্প দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে। পর্যটকরা বাংলাদেশে ভ্রমণের মাধ্যমে দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানে। ফলে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিদেশি সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রচার প্রসারণে অবদান
পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রচার প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যটকদের সামনে দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি, হস্তশিল্প এবং বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক উপাদান তুলে ধরা হয়। এর ফলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশ লাভ করে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হয় এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা
পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ ভ্রমণের জন্য দেশি বিদেশি বহু প্রিয় মানুষের কাছে অনেক জরিপের শীর্ষে।
তাই তো কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন,
এই পৃথিবীতে এক ঘ্রাণ আছে সবচেয়ে সুন্দর করুণ
সেখানে সূর্যের ভোর আছে মধুময়ী মাঠে অরুণ।
আমাদের আছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, সুদৃশ্য ম্যানগ্রোভ বন, বিস্তীর্ণ সুন্দর লিপ্ত, পাহাড় – নদী – ঝর্ণা। দেশের আনাচে কানাচে ছড়ানো সোনালি স্মৃতির ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং গ্রাম্য সংস্কৃতির অনন্য রূপ। রয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন, ও অন্যান্য ট্যুরিস্ট এলাকা। এরমধ্যে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হিসেবে পর্যটকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়াও পাহাড়ি অঞ্চল এবং ঐতিহাসিক পুরাতন স্থাপনা (পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি) পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। এ সকল স্থান পর্যটনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আমাদের দেশের পর্যটন শিল্প এখনো অনেক পিছিয়ে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য যেসব সুযোগ সুবিধার দরকার তার ঘাটতি রয়েছে। বিদেশিদের জন্য ভিসা ব্যবস্থা জটিল, দেশে আসার পর পর্যটন শিল্পের জন্য সঠিক গাইড নেই। উন্নত মানের আবাসন ব্যবস্থা, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা, বিনোদন কেন্দ্র ও পর্যটন স্পট উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়
বিভিন্নভাবে পর্যটন শিল্প বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত হলে গতি যে, পর্যটন অপরিহার্য খাত এবং অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য আমাদের করণীয়
প্রথমত: দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। কারণ, দেশে বেড়ানোর সময় রাস্তায় যানজট কাটাতে গিয়ে পর্যটকদের নানারকম বিরক্তির সম্মুখীন হতে হয়। বিদেশিরা আসতে চান, কিন্তু ভিসা পেতে গিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়। পর্যটন এলাকায় থাকার জন্য পর্যাপ্ত হোটেল বা আবাসিক হোটেল, বিনোদন কেন্দ্র তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: বৃহৎকৃত জায়গায় গুলাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে হোটেলের সেই সেবা নেই সেখানে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পর্যটকরা যেন নিরাপদে থাকতে পারে সেই বিষয়ে নজর দিতে হবে।
তৃতীয়ত: বিভিন্ন পর্যটনস্থল সময় মত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম, বিদ্যাশ্রম নিয়ে বা বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন দিয়ে পর্যটনের সুযোগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত: বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য খেলাধুলার ইভেন্ট যেমন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, আন্তর্জাতিক ফুটবল, অলিম্পিক, সার্ক গেম এর আয়োজন যেন বাংলাদেশে করে তাই পর্যটনের আকর্ষণ বাড়ানো হবে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে আমাদের করণীয়
কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কবিতায় এদেশের প্রকৃতির অপার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে,
ধন ধান্যে পূর্ণ দেশ আমাদের এই বসুন্ধরা,
তাহার মাঝে আছে দেশ সকল দেশের সেরা
এই সুন্দর দেশকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব, সরকারি প্রশাসন পর্যটনশিল্প বিকাশের উদ্যোগ এবং দেশের সব মানুষকেই সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে হবে। পর্যটনশিল্প বিকাশের জন্য প্রথমেই যেটা করতে হবে সেটা হলো সরকারের উদ্যোগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। যাতে দেশের বিভিন্ন জেলা, নগর, পর্যটন নগরী, পর্যটন এলাকা সব জায়গায় পর্যটকরা যেতে পারে, বিনোদন করতে পারে, ঘুরে দেখতে পারে। একইসাথে সরকারের বিভিন্ন বিভাগকে বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে পর্যটন এলাকা তৈরি করতে হবে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশের অন্তরায়
ওপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যে সকল কারণগুলির জন্য আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশ হচ্ছে না, তাদের মধ্যে অন্যতম হল:
১. দুর্বল অবকাঠামো: ভ্রমনের সুবিধা নিশ্চিতের জন্য পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে যোগাযোগ, আবাসন ও অন্নান্য অবকাঠামোর অভাব রয়েছে।
২. অনভিজ্ঞ সেবাকর্মী: ভ্রমণের সহযোগিতাকারী গাইড, বেয়ারা, সেবাকর্মী রা এই খাতের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও দক্ষ নয় ৷
৩. প্রচারের অভাব: দেশে ও বিদেশের পর্যটকদের কাছে বেশিরভাগ পর্যটন কেন্দ্রগুলির খবর পৌঁছানো হয়নি বা হলেও ভালোভাবে জানানো হয়নি।
৪. নিরাপত্তা: পর্যটকদের ভ্রমণের নিরাপত্তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ও টুরিস্ট পুলিশের পেশাগত দক্ষতা ও লোকবলের অভাব রয়েছে।
৫. অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ: আধুনিক বিষের মতো আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়নি, তাই দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে না।
৬. রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ হরতাল অবরোধে যোগাযোগ বন্ধ থাকে, মানুষ বাইরে যেতে ভয় পায়, এবং বিদেশী পর্যটকগণ ভ্রমনে নিরুৎসাহিত হন।
পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটকে আগমন ২০১৭ সালে ২.৫৯ লাখ থেকে ২০১৯ সালে ৬.২১ লাখে পৌঁছে। তারপর করোনার সময় কিছুটা নিম্নগামী হলেও আবার বিদেশী পর্যটকদের আগমনের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যটন খাত নতুন নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করছে, সরকার আশা করছে ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যটন খাত ১০% নতুন কর্মসংস্থান তৈরী করবে। ২০২১ সালে সরকার পাঁচ বছরের পর্যটন মাস্টার প্ল্যান চালু করেছে, যার লক্ষ্য ২০২৫ সালে বিদেশি পর্যটক আগমনের সংখ্যা ১০ লাখে এবং ২০৩০ সালে ২০ লাখে উন্নীত করা।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রসমূহ
আমাদের দেশের জনপ্রিয় সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্রসমূহের দিকে তাকানো যাক, কেননা এই দেশের রুপে বারেবারেই বিহমিত হয়েছেন কবি সাহিত্যিকেরা। তাইতো বিখ্যাত কবি, জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন,
বাংলার মুখ দেখিয়াছি,
তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর!
এই বাংলার রুপের লিলাভুমিতে যেসকল পর্যটন কেন্দ্রে সারাবছর ভ্রমনপ্রিয়সি দেশি বেদেশি পর্যটকদের আনাগোনা থাকে।
সুন্দরবন
বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চলে ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারে অধিক জায়গা জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। সুন্দরবনে ২৮ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ রয়েছে, যার মধ্যে সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, কেওড়া, লবণ, মহানিম, হিজল, ঝাউ, গোলপাতা, বেত ইত্যাদি। এই গাছগুলি জোয়ার-ভাটার পানির মধ্যে বেঁচে থাকতে সক্ষম। সুন্দরবন একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী আবাসস্থল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাঘের আবাসস্থল এবং এখানে ১০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩০০ প্রজাতির পাখি, ১০০ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২৫০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, চিতাবাঘ, কুমির, কিং কোবরা, হাঙর, বানর, কচ্ছপ, সাপ, পাখি ইত্যাদি। সুন্দরবন বাংলাদেশের পরিবেশ এবং অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করে। রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকগণ নৌযানে করে সুন্দরবনের ছোটোবড়ো খালে ভ্রমণ করেন। ২০২২ সালে, সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন প্রায় ১০ লাখ পর্যটক যার ১০% পর্যটক ছিলেন বিদেশী।
সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রসমূহ
১৯১৯ সালে সিলেট ভ্রমন করেন কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, সিলেটের রুপে বিহমিত হয়ে তিনি লিখেনঃ
মমতাবিহীন কালস্রোতে
বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হতে
নির্বাসিতা তুমি
সুন্দরী শ্রীভূমি।
চায়ের দেশ সিলেট অপুরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। রাতারগুল ছাড়াও এখানে অনেগুলি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র আছে।
রাতারগুল: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল একটি বিশাল জলাবন। বনটি প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। বর্ষাকালে বনের প্রায় পুরোটা পানিতে নিমজ্জিত হয়, তখন পর্যটকেরা নৌকায় করে বনের মাঝে ঘুরে আসতে পারেন। এই বনে আছে কদম, হিজল, অর্জুন, ছাতিম প্রভিতি গাছ এবং বনের মাঝে ভ্রমণের সময় বানর, বেজি, গুইসাপ, সাদাবক, মাছরাঙ্গা, বনবিড়াল সহ প্রভিতি প্রাণীর দেখা মিলে। পানিতে নিমজ্জিত গাছের মাঝে নৌকাভ্রমণের রোমাঞ্চ এর টানে প্রতিবছর এখানে প্রচুর দেশি- বিদেশী পর্যটক আসেন।
সিলেটের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলির মধ্যে রয়েছে
ক) বিছনাকান্দি: বিছানাকান্দি একটি ছোট গ্রাম যা তার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ছোট বড় পাথরের উপর দিয়ে ছুটে আসা স্বচ্ছ পানির স্রোতধারা এর সৌন্দর্যেকে আরও অতুনীয় করে তোলে।
খ) জাফলং: সিলেট বিভাগের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্ৰ। এটি পিয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত পাহাড়, পাথর এবং ঝর্ণা দ্বারা বেষ্টিত। জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে পর্যটকেরা ওপারের ভারতের ডাউকি সেতু দেখতে পারেন। পাশেই রয়েছে একটি ছোট কিন্তু মনোরম ঝর্ণা জাফলং ঝর্ণা। জাফলংয়ের চা বাগানেও অনেকে প্রকৃতি প্রেমী পর্যটকের দেখা মিলে।
গ) মালনীছড়া চা বাগান: সিলেট জেলায় অবস্থিত এটি উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন চা বাগান। মালনীছড়া চা বাগান ১৮৫৪ সালে লর্ড হার্ডসন ১৫০০ একর জায়গার উপর এটি প্রতিষ্ঠা করেন। মালনীছড়া চা বাগান ভ্রমণের জন্য সেরা সময় হল শুষ্ক মৌসুম (অক্টোবর থেকে মার্চ)। এই সময়ে আবহাওয়া হালকা এবং মনোরম থাকে। তবে, বর্ষাকালও মালনীছড়া চা বাগান ভ্রমণের জন্য ভালো সময়, থখন চা গাছের সবুজ রঙ আরও ঘন এবং উজ্জ্বল হয়।
ঘ) ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর: পাহাড়ি নদী, সাদা পাথর আর ভারতের মেঘলায় রাজ্যের সীমান্ত পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে শত শত দেশি বিদেশি পর্যটকে ছুতে আসেন এখানে। এখানে বর্ষাকালে নৌকায় করে পাহাড়ি স্বচ্ছ ধলাই নদীতে ভ্রমণ করা যায়।
বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত
কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত ও পর্যটন স্থান। এটি লম্বায় ১২০ কিলোমিটার যা পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত তার সাদা বালি, নীল জল এবং সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য জনপ্রিয়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি বিদেশী পর্যটক ভ্রমনে আসেন। এছাড়াও পর্যটকেরা চট্টগ্রামের পতেজ্ঞা, কক্সবাজারের ইনানী, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, সুন্দরবনের কটকা সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণে যান। তাই তো জাতীয় কবি বলেছেন,
সাগর আমায় ডাক দিয়েছে মন-নদী তাই ছুটছে ওই।
পাহাড় ভেঙে মাঠ ভাসিয়ে বন ডুবিয়ে তাই তো বই।।
প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন
সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, যা দেশের সর্ব দক্ষিণ সীমারেখা। এই দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার। দ্বীপটি একটি প্রবাল প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। সেন্ট মার্টিন মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থানে পরিণত হয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চল
বিখ্যাত দার্শনিক জন লুব্বক বলেছেন,
আকাশ, পৃথিবী, গাছ, পাহাড় হলো সবচেয়ে বড় শিক্ষক, তারা বইয়ের বাইরেও
জীবন সম্পর্কে অনেক জ্ঞান দিয়ে থাকে।
জ্ঞান অর্জনের জন্য ভ্রমন করতে পারেন, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। পর্যটকেরা পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের ছোয়ার আনন্দ ও প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারার কলতানে বিস্মিত ও বিহমিত হন। রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে নৌকা ভ্রমণ, ঝুলন্ত সেতু, নিবিড় পাহাড়ের বোনরাজির মায়া ও পাহাড়ি জনজাতির সরল আদিম জীবন পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে পরিপূর্ণ করে। এছাড়া খাগড়াছড়ি জেলার আলুটিলা পাহাড়, রিসাং ঝর্ণা, সাজেক ভ্যালি, মায়াবিনী লেক প্রভিতি পর্যটন কেন্দ্রের রূপের টানে ছুতে আসেন দেশি বিদেশি ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা।
নিকলী হাওর
নজরুলের গানে আমরা গ্রাম বাংলার আরেক রূপ দেখতে পাই :
একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী
ফুলে ও ফসলে কাদা-মাটি-জলে ঝলমল করে লাবণী
নিকলী হাওর কিশোরগঞ্জ জেলার একটি বিশাল জলাভূমি। এটি কিশোরগঞ্জ সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল নেমে আসলে নিকলী হাওরের শত শত বিল ঝিল যদি একসাথে মিলিত হয়। তখন নৌকায় করে হাওর ভ্রমণ করতে দারাদেশের মানুষেরা ছুতে আসেন। নৌকা ভ্রমণের পাশাপাশি মানুষ হাওরের নতুন পানির দেশি মাছের স্বাদ নেয়, বর্ষায় ফসলের ক্ষেত পানিতে ডুবে থাকলেও, পর্যটক আসার কারণে কৃষকেরা বাড়তি যায় করতে পারেন।
বাংলাদেশের পুরাকীর্তিক পর্যটন স্থান
মাঠের সবুজ থেকে সূর্যের লাল
বাংলাদেশের বুক এতোই বিশাল
বাংলাদেশের বিশালতার যেন শেষ নেই, আমাদের এই দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ তাইতো দেশের আনাচে কানাচে দেখা মিলে অনেক পুরাকৃতির। এদের মধ্যে অন্যতম, বৌদ্ধবিহার সমুহ। পুণ্ড্রবর্ধন বৌদ্ধবিহারটি বগুড়ার মহাস্থানগড়ে অবস্থিত। এটি ৭ম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। আরেক বিখ্যাত বিহার হল, সোমপুর মহাবিহার এটি নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত। এটি ৮ম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীন কালের দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, পুরান ঢাকার লালবাগের কেল্লা, বুড়িগংগার তীরবর্তী আহসান মঞ্জিল, সোনারগাঁয়ের পানাম নগর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুষ মসজিদ এগুলি দেশের অন্যতম প্রাচীর পুরাকৃতিক নিদর্শন এবং প্রাণপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্ৰ।
ঐতিহাসিক স্থাপনা পর্যটন স্থান
বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে আরেক শ্রেণীর স্থাপত্য যেগুলির ফলকে ফলকে লেখা আছে আমাদের মহান সংগ্রামের ইতিহাস। এদের মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা মেডিকেল প্রঙ্গনে ৫২’র ভাষা আন্দোলনের শহীদের উদ্দেশ্য নির্মিত কেন্দ্রীয় শাহিদ মিনার, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের স্মৃতির স্মরণে সাভারে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। আবার ঢাকার শাহবাগে আছে জাতীয় জাদুঘর, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বাঙালি জাতির রূপকার বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ, মিরপুরে মহান মুক্তিযুদ্ধের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, এবং ঢাকার সোয়ার্দী উদ্দানে স্থাপিত স্বাধীনতা জাদুঘর ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
মেগা প্রকল্প পর্যটন স্থান
সাবাস, বাংলাদেশ,
এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়ঃ
জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই কবিতারই বাস্তব প্রতিফলন আমাদের এই মেগা প্রকল্পগুলো। পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে অবকাঠামোগত ভাবেও বাংলাদেশ অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যেগুলি যোগাযোগের পাশাপাশি পর্যটন গন্তব্যে পরিনিত হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম পদ্মা সেতু। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সাথে দেশের অন্যান্য অংশের সংযোগ স্থাপন করেছে। ২০২২ সালের ২৫ জুন সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। মাওয়ার ইলিশ ও পদ্দা সেতু দেখার জন্য অনেকে ছুটির দিনে এখানে ভিড় জমায়। ঢাকা নগরবাসীর যাতায়তের জন্য আরেক মেগা প্রকল্প মেট্রোরেল চালু হয়েছে। গণপরিবহন হলেও নগরের মানুষের উপর থেকে শহর দেখার নতুন মাত্রা দিয়েছে মেট্রোরেল প্রকল্প। এছাড়াও মাওয়া এক্সপ্রেস ওয়ে, মেরিন ড্রাইভ রোড, রুপুর পারমাণবিক কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল এর মতো মেগা প্রকল্পগুলি পর্যটকদের আকর্ষিত করছে।
উপসংহার
বাংলাদেশে প্রবেশের হাজার দুয়ার খোলা রয়েছে কিন্তু বেরুবার একটিও নেই।
কেননা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চিরসবুজ বাংলার রূপের বিশালতা ও ব্যাপকতা, পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি দেশী বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্যে যথেষ্ঠ। তবে পর্যটনের সম্ভাবনাকে সত্যি করতে হলে আমাদের পর্যটন বান্ধব নীতিমালা ও এর সঠিক প্রয়োগ দরকার। সরকার পর্যটকদের ভ্রমণের সুবিধা বৃদ্ধিসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে অপরদিকে পর্যটন কেন্দ্রের আশেপাশের অধিবাসীরা পর্যটকদের সহযোগিতা করবে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের অতিথি পরায়ণতা, মানবিক সংস্কৃতি, রূপের বর্ণনা, ইতিহাস ঐতিহ্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল হবে।