আম-আঁটির ভেঁপু
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
(১) মিসেস শাহানার দিন শুরু হয় কাকডাকা ভোরে। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় দেওয়া, ছেলে-মেয়ের টিফিন তৈরি করা, তাদের বাবার নাস্তা- এরপর নিজে তৈরি হয়ে অফিসে যাওয়া। তার মেয়ে সারা দশম শ্রেণিতে আর ছেলে সামি অষ্টম শ্রেণিতে- তাদেরও কোনো ফুরসত নেই। স্কুল শেষে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, গণিত, আরো কত কোচিং, বাড়ি ফিরে আবার স্কুলের কাজ, বাড়ির কাজ, কোচিং এর কাজ। স্কুল- কোচিং আর বাড়ির চার দেয়াল এই যেন তাদের জীবন। বাবা-মা অফিস শেষে তাদের পছন্দের খাবার নিয়ে ফেরেন, নয়তো নিজেরাই অনলাইনে অর্ডার দিয়ে পছন্দের খাবার আনিয়ে নেয়।
(ক) অবহেলায় পড়ে থাকা অপুর কাঠের ঘোড়াটিকে কীসের সাথে তুলনা করা হয়েছে?
(খ) দশঘরার লোকটির প্রস্তাবে হরিহর তৎক্ষণাৎ রাজি হয়নি কেন?
(গ) উদ্দীপকের মিসেস শাহানার সাথে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের সর্বজয়ার সংসার জীবনের যে বৈসাদৃশ্য তা ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) “উদ্দীপকের বক্তব্য ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের মূল বক্তব্য থেকে অনেক দূরে।”- মন্তব্যটির যৌক্তিকতা দেখাও।
উত্তর
(ক) অবহেলায় পড়ে থাকা অপুর কাঠের ঘোড়াটিকে পিজরাপোলের আসামির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
(খ) নিজের আর্থিক অসচ্ছলতা প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে হরিহর দশঘরার লোকটির প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়নি।
‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পে হরিহর ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হলেও দারিদ্র্যের কষাঘাতে তার নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। গ্রামের অন্নদা রায়ের বাড়িতে গোমস্তার কাজ করে যে অল্প কয়টা টাকা পায় তা দিয়ে তার সংসার ঠিকঠাক চলে না। চারদিকে তার দেনার বোঝা। এমন অবস্থায় দশঘরার এক সঙ্গোপ হরিহরকে তার এলাকায় ব্রাহ্মণ হিসেবে মন্ত্র দিতে এবং সেই গ্রামে গিয়ে বাস করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু হরিহর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি, কারণ এতে ব্রাহ্মণ হিসেবে তার আত্মসম্মানে বাধে এবং লোকটি তার অসচ্ছল অবস্থা বুঝে যেত। এ ছাড়া পাওয়ানাদাররাও তাদের টাকা-পয়সা চেয়ে বসবে, না পেলে যেতে দেবে না।
(গ) উদ্দীপকের মিসেস শাহানার সঙ্গে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের সর্বজয়ার সংসার জীবনের বৈসাদৃশ্য রয়েছে তাদের আর্থিক অবস্থায়, তাদের পরিবেশ-পরিস্থিতিতে, তাদের জীবনযাপনে।
গ্রামবাংলার মানুষের জীবন অত্যন্ত সহজ-সরল। ফলে জীবন সেখানে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ ও আনন্দময়। তা সত্ত্বেও দারিদ্র্য সেখানকার এক বড়ো সমস্যা। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে খেয়ে-না-খেয়ে সেখানে অনেকের জীবন অতিবাহিত হয়। অন্যদিকে শহরের সচ্ছল জীবনের চিত্রটি গ্রামের এই চিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
উদ্দীপকের মিসেস শাহানার দিন শুরু হয় কাক-ঢাকা ভোরে। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় দেওয়া, ছেলে-মেয়ের টিফিন তৈরি করা,তাদের বাবার নাস্তা- এরপর নিজে তৈরি হয়ে অফিসে যাওয়া, এভাবেই চলে তার জীবন। অন্যদিকে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের সর্বজয়ার অভাবের সংসার। বাড়িটিও জীর্ণ ও ভাঙাচোরা। ছেলে- মেয়ের মুখে সে ঠিকমতো খাবারও তুলে দিতে পারে না। সন্তানের পরণের ছেঁড়া কাপড় তার অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে। তার উপর ঋণের বোঝা তো আছেই। স্বামীর সামান্য বেতনে অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয় তাকে। যা উদ্দীপকের মিসেস শাহানার জীবনের তুলনায় পুরোপুরি আলাদা।
(ঘ) “উদ্দীপকের বক্তব্য ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের মূল বক্তব্য থেকে অনেক দূরে।”- মন্তব্যটি যৌক্তিক।
স্থান-কাল-পাত্রভেদে মানুষের জীবন ভিন্নতর হয়ে থাকে। কেউ জীবনে অনেক কিছু পায়, আবার কেউ তেমন কিছুই পায় না। কেউ বড়ো হয় প্রকৃতির সান্নিধ্যে, আবার কেউ বড়ো হয় শহরের ইট- পাথরের চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ থেকে। এভাবেই কেউ সচ্ছল জীবন কাটায়, আবার কেউ অসচ্ছলতার মধ্যেই জীবন পার করে দেয়।
উদ্দীপকে শহরের একটি আধুনিক জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বৃত্তাবদ্ধ এক একঘেয়ে জীবন। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়া, পরিবারের সবার খাবার তৈরি করে নিজেরাও অফিসে যাওয়া, ছেলে-মেয়েদের স্কুল, কোচিং, বাড়ি ফিরে আবার বাড়ির কাজ। এভাবে বাচ্চাদের স্কুল কোচিং আর বাড়ির চার দেয়াল- এই যেন তাদের জীবন। বাবা-মা অফিস শেষে খাবার আনেন, নয়তো নিজেরাই অনলাইনে অর্ডার দিয়ে পছন্দের খাবার আনিয়ে খেয়ে নেয়। উদ্দীপকে এই পরিস্থিতি বা বক্তব্য ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের পরিস্থিতি বা মূল বক্তব্য থেকে ভিন্নতর।
‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পটি গ্রামবাংলার চিরায়ত এক জীবন উপাখ্যান। সেখানে আর্থিক অসচ্ছলতা সত্ত্বেও জীবনকে উপভোগ করার বিষয়টি দৃশ্যমান। শৈশবের দুরন্তপনা, বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, গ্রামীণ জীবনে দুটি ভাই-বোনের খুনসুটি, হেসে-খেলে বেড়ানো, মায়ের শাসনে ভীত হয়েও তাকে ফাঁকি দিয়ে দুষ্টুমিতে মেতে ওঠা, সর্বজয়ার দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন এবং জীবন নিয়ে আশাহত না হওয়ার দিকগুলো গল্পে ফুটে উঠেছে, যা উদ্দীপকের বক্তব্য থেকে অনেক দূরে।
(২) (i) আমরা ক’জন দুষ্টু ছেলের দল,
গাছের তলায় গড়েছি মোদের আস্তানা।
পাঠশালার শাসন-বারণ ভেঙেছি মেলা,
বড় দীঘির পানিতে ভাসিয়েছি ভেলা।
(ii) নুন আনতে পান্তা ফুরোয়,
চাল আনতে ডাল,
মাসের মধ্যেও কেনা হয়ে ওঠে না;
আদা পেঁয়াজ আর ঝাল।
(ক) ‘রোয়াক’ কী?
(খ) সর্বজয়ার কথা বন্ধ হবার উপক্রম হলো কেন? বুঝিয়ে লেখ।
(গ) উদ্দীপক (ⅰ)-এ ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের যে চিত্র ধরা পড়েছে- তা ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) উদ্দীপক (ii)-কে ছাপিয়ে উদ্দীপক (ⅰ)-এর ভাবার্থ যেন ‘আম- আঁটির ভেঁপু’ গল্পে প্রাধান্য বিস্তার করেছে- মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।
উত্তর
(ক) ‘রোয়াক’ হলো ঘরের সামনের খোলা জায়গা বা বারান্দা।
(খ) স্বামী হরিহরের মুখে দশঘরার এক অবস্থাপন্ন লোকের প্রস্তাব শুনে আগ্রহে স্ত্রী সর্বজয়ার কথা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো।
‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের হরিহর রায়বাড়িতে গোমস্তার কাজ করে এবং বিভিন্ন লোকের বাড়িতে পূজা করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছিল। ব্রাহ্মণ হওয়ায় দশঘরার এক অবস্থাপন্ন সঙ্গোপ তাকে তাদের গ্রামে গিয়ে বাস করতে বলে। বসতবাড়ির পাশাপাশি ধানের জমিও দিতে চায় তারা। হরিহর এই কথা স্ত্রী সর্বজয়াকে বললে আগ্রহের আতিশয্যে তার কথা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো।
(গ) উদ্দীপক (ⅰ)-এ ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ শিশুর আনন্দপূর্ণ শৈশবের চিত্র ধরা পড়েছে।
গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতি তার রূপসুধা উন্মুক্ত করে দেয় সবার জন্য। সেখানে সবাই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার সুযোগ পায় প্রকৃতির সান্নিধ্যে। তবে এ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে শিশুরা। তারা মুক্ত বিহঙ্গের মতো প্রকৃতির কোলে আনন্দিত জীবন কাটায়।
উদ্দীপক (i)-এর দুষ্টু ছেলেদের আনন্দিত জীবনের কথা বলা হয়েছে। গ্রামীণ প্রকৃতিতে গাছের তলায় তারা আস্তানা গড়েছে। শাসন-বারণের বাঁধ ভেঙে, দিঘির জলে ভেলা ভাসিয়ে আনন্দে মেতেছে তারা। এমনই এক আনন্দঘন জীবনের ছবি ভেসে উঠেছে আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পটিতে। গল্পে গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতিঘনিষ্ঠ দুই ভাই-বোনের আনন্দিত জীবনের আখ্যান বর্ণিত হয়েছে। অপু ও দুর্গা প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা দুই ভাই-বোন। তারা উভয়ে গ্রামীণ ফলফলাদি কুড়িয়ে, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেরিয়ে আনন্দপূর্ণ শৈশব কাটিয়েছে। এ চিত্রই উদ্দীপক (i)-এ ধরা পড়েছে।
(ঘ) উদ্দীপক (ii)-কে ছাপিয়ে উদ্দীপক (ⅰ)-এর ভাবার্থ যেন ‘আম- আঁটির ভেঁপু’ গল্পে প্রাধান্য বিস্তার করেছে- মন্তব্যটি যথার্থ।
পৃথিবীতে ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণির মানুষ বসবাস করে। সেক্ষেত্রে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সবার জীবনেই আসে। কেউ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও জীবনের আনন্দ খুঁজে পায়। দরিদ্রতাকে জয় করে সে পরম আনন্দে দিন কাটায়।
উদ্দীপক (i)-এ একদল প্রাণচঞ্চল শিশুর আনন্দময় জীবনের ছবি ভেসে উঠেছে। তারা বাঁধনহারার দল। সব বাধা পেরিয়ে তাদের জীবনে আনন্দ এসে ধরা দিয়েছে যেন প্রকৃতির হাত ধরে। অন্যদিকে উদ্দীপক (ii)-এ জনৈক ব্যক্তির নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা। দরিদ্র জীবনের ছায়াপাত ঘটেছে এখানে। এখানে আলোচ্য ‘আনন্দিত জীবন’ ও ‘দরিদ্র জীবন’ উভয়ই ফুটে উঠেছে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পে। তবে উদ্দীপক (i) অংশটির মতো আনন্দময় শৈশবটি অপু- দুর্গার জীবনে মুখ্য হয়ে উঠেছে।
‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পে অপু ও দুর্গার আনন্দিত জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। তাদের জীবনে দারিদ্র্যের কশাঘাত থাকলেও কখনই আনন্দ মিলিয়ে যায়নি। তাদের জীবনের না পাওয়াগুলো প্রকৃতিই পূরণ করে দিয়েছে। প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়িয়ে, প্রকৃতির ফলফলাদি আহরণ করে প্রকৃতি ঘনিষ্ঠ এই দুই শিশু তাদের জীবনকে উপভোগ করেছে পরম আনন্দে। দারিদ্রাকে ছাপিয়ে অণু ও দুর্গার আনন্দিত জীবনের এই কাহিনিই প্রাধান্য পেয়েছে আলোচ্য গল্পে। তাই বলা যায়, প্রশ্নোত্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
(৩) (i) মুন আনতে পান্তা ফুরোয়,
চাল আনতে ডাল,
মাসের মধ্যেও কেনা হয়ে ওঠে না;
আদা পেঁয়াজ আর ঝাল।
(ii) আমরা ক’জন দুষ্টু ছেলের দল,
গাছের তলায় গড়েছি মোদের আস্তানা।
পাঠশালার শাসন বারণ ভেঙেছি মেলা,
বড় দীঘির পানিতে ভাসিয়েছি ভেলা।
(ক) ভেরেন্ডাকটার বেড়া কী?
(খ) “তুই তো একটা হাবা ছেলে”- এ কথা বলার কারণ বুঝিয়ে লেখ।
(গ) উদ্দীপকে (i) এ ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের যে চিত্র ধরা পড়েছে তা ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) উদ্দীপকে (i) কে ছাপিয়ে উদ্দীপক (ii) এর মর্মার্থ যেন ‘আম- আঁটির ভেঁপু’ গল্পে প্রাধান্য বিস্তার করেছে- মন্তব্যটি বিচার কর।
উত্তর
(ক) ভেরেন্ডাকচার বেড়া হলো এরন্ড বা রেড়ি গাছের বেড়া।
(খ) তুই তো একটা হাবা ছেলে’ এ কথাটি স্নেহমিশ্রিত তিরস্কারে সাবধান করার জন্য ছোট ভাই অপুকে দুর্গা বলে।
দুর্গা অন্য একজনের বাগান থেকে আমের কুসি বা কচি আম কুড়িয়ে আনে। তারপর মায়ের ভয়ে সে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ভাই অপুকে ডাকে। ভাইকে সে লবণ আর তেল আনতে বলে। মেঝেতে তেল পড়লে মা গালাগালি করবে। তাই সে অপুকে সতর্কতার সঙ্গে তেল ঢালতে বলে যেন ঘরের মেঝেতে না পড়ে। ভাইকে সতর্ক থাকার জন্যই মূলত দুর্গা প্রশ্নোক্ত কথাটি বলে।
(গ) উদ্দীপক (ⅰ) এ ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের দারিদ্র্যের চিত্রটি ধরা পড়েছে।
এ জগতে সবার অবস্থা এক রকম নয়। কেউ বসৰাস করে অর্থের প্রাচুর্যের মধ্যে, আবার কারও বসবাস চরম দরিদ্রতার মধ্যে। দরিদ্রতা হলো এমন একটি অবস্থা যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মেটাতে অক্ষম। দরিদ্র মানুষের প্রতিদিনের জীবন কাটে দারিদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে। তারা সুখী ও সুন্দর জীবন গঠন করতে পারে না। ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পে এমনই এক দরিদ্র পরিবারের আখ্যান প্রকাশ পেয়েছে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত এক ব্রাহ্মণ পরিবারের প্রধান হরিহর। তার সামান্য আয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে দিনাতিপাত করা কষ্টসাধ্য। তাই তাদেরকে ধার-দেনা করে চলতে হয়। হরিহর তার ছেলে-মেয়েকে কোনো খেলনা কিনে দিতে পারে না। তাই তারা অন্যের পুরানো খেলনা দিয়েই খেলে। হরিহরের ঘরের প্রতিটি কোনায় কোনায় দরিদ্রতা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। উদ্দীপক- (i) এ এমনই এক দরিদ্র পরিবারের শোচনীয় অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। দেখা যায়, ওখানেও নুন আনতে পান্তা ফুরায়। চাল, ডাল, আদা, পেঁয়াজসহ নিত্য ব্যবহার্য কোনোকিছুই তারা প্রয়োজন মতো কিনতে পারে না। তাই বলা যায়, উদ্দীপক-(i) এ ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের দরিদ্রতার চিত্রটি পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।
(ঘ) উদ্দীপক (ⅰ) কে ছাপিয়ে উদ্দীপক (ii)-এর মমার্থ যেন ‘আম- আঁটির ভেঁপু’ গল্পে প্রাধান্য বিস্তার করেছে- মন্তব্যটি যথার্থ।
শৈশব মানবজীবনের সবচেয়ে সুখের সময়। শৈশব মানেই দুরন্তপনা, অনাবিল আনন্দ। এসময় কোনো পিছুটান থাকে না। পারিবারিক ঝঞ্ঝাট, দীনতা বা যেকোনো সমস্যাই থাকুক না কেন, কোনোকিছুই শৈশবের দুরন্তপনাকে আটকে রাখতে পারে না। সবকিছুকে ছাপিয়ে শৈশবে সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে ছুটে চলে।
‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পে লেখক শৈশবের দুরন্তপনার চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন অপু ও দুর্গা চরিত্রের মধ্য দিয়ে। ডানপিটে কিশোরী দুর্গা, যার বয়স এগারো বছর। এই কিশোরী দিনের বেশিরভাগ সময় বাড়িতে থাকে না। কার বাগানের আম গুটি ধরেছে, কার বাগানের জাম পেকেছে এগুলো তার নখদর্পণে। সারা দিন বনে- জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে নানা কিছু সে সংগ্রহ করে তারপর সেগুলো ভাইয়ের সঙ্গে ভাগ করে খায়। শৈশবে দুরন্তপনার এক চমৎকার আখ্যান রয়েছে এই গল্পে। এর পাশাপাশি পল্লি মায়ের শাশ্বত রূপ, দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত পরিবার, প্রকৃতির বর্ণনা ইত্যাদি উঠে এসেছে এই গল্পে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে অপু-দুর্গার শৈশবের দুরন্তপনাই এই গল্পের প্রধান সুর হয়েছে।
উদ্দীপক (ii)-এও শৈশবের দুরন্তপনার চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে দেখা যায় কয়েকজন দুরন্ত ছেলের দল যারা গাছের তলায় আস্তানা গড়েছে। এ বিষয়টি যেন দুর্গার প্রকৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়কে নির্দেশ করছে, যা আলোচ্য গল্পের প্রধান বিষয়। অপরদিকে উদ্দীপক (i)-এর চিত্র হরিহরের দারিদ্র্যকে নির্দেশ করে। তবে তা এই গল্পের মূল হয়ে ওঠেনি। তাই বলা যায়, উদ্দীপক (ⅰ)-কে ছাপিয়ে উদ্দীপক (ii)-এর মমার্থ ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
(৪) সিধু তার দরিদ্র পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। সে ভীষণ ডানপিটে এবং দুরন্ত। সারাদিন গ্রামের ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করে এবং বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। প্রকৃতিই যেন তার একমাত্র আশ্রয়। কোন গাছের আম মিষ্টি, কার বাগানের কলা পাকলো বলে- ইত্যাদি খবর তার চেয়ে কেউ ভালো জানে না। কারণ সে সারাদিন এখানে-সেখানে ঘুরে ঘুরে এসব তথ্য সংগ্রহ করে। তার এমন কাজকর্মে গ্রামের সবাই • অতিষ্ঠ। অভিযোগ শুনতে শুনতে তার মায়ের কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। তাই তার মা সব সময় সিধুর কর্মকাণ্ডে ভীষণ উদ্বিগ্ন থাকেন।
(ক) হরিহর কার বাড়িতে কাজ করে?
(খ) ‘আমার এমন হয়েছে যে ইচ্ছে করে একদিকে বেরিয়ে যাই।’- সর্বজয়ার এ কথার কারণ কী? ব্যাখ্যা কর।
(গ) উদ্দীপকের সিধু চরিত্রের সাথে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের কোন চরিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে তা বর্ণনা কর।
(ঘ) তুমি কী মনে কর উদ্দীপকের সিধুর মা ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের সর্বজয়ার মতো পল্লিমায়ের শাশ্বত রূপ হতে পেরেছে? উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
উত্তর
(ক) হরিহর গ্রামের অন্নদা রায়ের বাড়িতে কাজ করে।
(খ) ‘আমার এমন হয়েছে যে ইচ্ছে করে একদিকে বেরিয়ে যাই।’- সর্বজয়ার এ কথা বলার কারণ হলো দারিদ্র্য।
‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের এক দরিদ্র পরিবারের বউ সর্বজয়া। স্বামী হরিহরের রোজগার খুবই কম। দুই সন্তান নিয়ে তাদের কোনো রকমে দিন পার হয়। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড অভাবের সময় তারা অন্যের কাছে ধার করে। কিন্তু সেই ধার আর শুধতে পারে না। চারপাশ থেকে পাওনাদারেরা চাপ দিতে থাকে। এমন অবস্থায় সর্বজয়া খুবই অসহায় বোধ করে। তাই ক্ষোভে, অভিমানে সে প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করে।
(গ) উদ্দীপকের সিধু চরিত্রের সঙ্গে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের দুর্গা চরিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে।
শৈশবের আরেক নাম দুরন্তপনা। শৈশবে মানুষের জীবন কাটে নানা ধরনের আনন্দ-উল্লাস, হইহুল্লোড়ে। বিশেষ করে যারা গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠে তাদের জীবন আরও বেশি রঙিন হয়। সারা দিন ছোটাছুটি, ঘোরাঘুরি করে তারা শৈশবের দিন কাটায়। তাদের জীবন যেন বাঁধভাঙা নদীর মতো। বিনা বাধায় শুধু ছুটে চলাই যেন শৈশবের ধর্ম।
‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের দুরন্ত এক চরিত্র দুর্গা। সে সব সময় প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়ায়। বাড়িতে শুধু দুটো খাওয়ার সাথে তার সম্পর্ক। কোথায় কার বাগানের আম কত বড় হলো, কার গাছের জাম পেকেছে ইত্যাদি খবর তার নখদর্পণে। এমন দুরন্তপনার জন্য মা সর্বজয়া তার প্রতি ভীষণ বিরক্ত। উদ্দীপকের সিধুও এমনই দুরন্ত আর ডানপিটে। সারা দিন সে ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করে আর বন- জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। প্রকৃতিই যেন তার একমাত্র আশ্রয়। সিধুকে নিয়েও তার মা উদ্বিগ্ন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের সিধু চরিত্রের সঙ্গে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের দুর্গা চরিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে।
(ঘ) হ্যাঁ, আমি মনে করি উদ্দীপকের সিধুর মা ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের সর্বজয়ার মতো পল্লিমায়ের শাশ্বত রূপ হতে পেরেছে।
এই পৃথিবীর সবচেয়ে আপন হলো মা। মায়ের সঙ্গে সন্তানের থাকে নাড়ির টান। সন্তানের হাজারো বায়না, হাজারো আবদার থাকে মাকে ঘিরে। সন্তান মায়ের কাছে যতটা প্রশ্রয়-আশ্রয় পায় ততটা আর কোথাও পায় না। মায়েরা সন্তানের শত শত দোষ লুকিয়ে ভালোবেসে যায়। আবার কোনো সন্তান যদি বেশি বেপরোয়া হয়ে যায় তখন মা-ই আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের শাশ্বত এক মাতৃরূপ সর্বজয়।। সন্তান। অপু ও দুর্গা। দুর্গা এগারো বছরের দুরন্ত কিশোরী। সে সারা দিন বাড়ির বাইরে বাইরে থাকে। বনে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে নানা ফল সংগ্রহ করে। তারপর সেগুলো বাড়িতে এনে ছোট ভাই অপুর সঙ্গে ভাগ করে খায়। মেয়ের এমন দুরন্তপনায় মা সর্বজয়া ভীষণ বিরক্ত। সে তার মেয়েকে উঁচু স্বরে রাগারাগি করে। সন্তানদের প্রতি তার ভালোবাসাও অগাধ। আবার শাসনের বেলায়ও কম যায় না। এমনই স্নেহ ও শাসনের সন্নিবেশে সর্বজয়া হয়ে উঠেছে গ্রামীণ বাঙালি মায়ের শাশ্বত রূপ।
উদ্দীপকের সিধুর মায়ের মধ্যেও সর্বজয়ার রূপ পরিলক্ষিত হয়। সিধুও দুর্গার মতো ডানপিটে ও দুরন্ত। সেও সারা দিন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। তাকে নিয়ে মায়ের কাছে নালিশের শেষ নেই। নালিশ শুনে সিধুর মায়ের কান ঝালাপালা হয়ে যায়। তারপরও সন্তানকে নিয়ে সে উদ্বিগ্ন থাকে। যার দ্বারা মূলত স্নেহের রূপ প্রকাশ পেয়েছে। সবকিছুকে ছাপিয়ে সিধুর মাও হয়ে উঠেছে বাঙালি মায়ের শাশ্বত রূপ। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের সিধুর মা ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ গল্পের সর্বজয়ার মতো পল্লিমায়ের শাশ্বত রূপ হতে পেরেছে।