শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব
নবম-দশম শ্রেণি
বাংলা ১ম পত্র
(১) ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দ্রুতগামী একটি যাত্রীবাহী বাস সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলে দু’জন নিহত হয় এবং অপর চারজন যাত্রী গুরুতর আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে। দুর্ঘটনাস্থলে একজন পথচারী নিহত ও আহত যাত্রীদের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। অথচ পার্শ্ববর্তী স্কুলের একজন শিক্ষক ঘটনাস্থলে এসে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশকে খবর দেন। পাশাপাশি তিনি আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
(ক) ‘হামেশা’ শব্দের অর্থ কী?
(খ) অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়ে মুক্তি বড় কেন? বুঝিয়ে লেখ।
(গ) উদ্দীপকের পথচারীর আচরণে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের যে দিকটি প্রকাশ পেয়েছে তা ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) উদ্দীপকে উল্লিখিত শিক্ষক যেন ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধ লেখকের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিত্ব। মূল্যায়ন কর।
উত্তর
(ক) ‘হামেশা’ শব্দের অর্থ- সব সময়, সর্বক্ষণ।
(খ) মুক্তির আনন্দ না থাকলে কোনো প্রাচুর্যই ভালোভাবে উপভোগ করা যায় না বলে অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়ে মুক্তি বড়।
অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়ে মুক্তি বড়- এই বোধটি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। আর অন্নবস্ত্রের চিন্তায় ব্যক্তির মনুষ্যত্বের সাধনা ব্যর্থ হয়ে যায়। কেননা অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্য মানুষকে সাময়িক সুখ দান করে। কিন্তু, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কেননা এতে পরিপূর্ণভাবে মনের সন্তুষ্টি থাকে না। মনকে তৃপ্ত রাখতে চাইলে মুক্তির আনন্দ থাকতে হয়। তাই মনুষ্যত্ববোধে উন্নীত মানুষ মুক্তিকেই প্রাধান্য দেয়। এজন্যই অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়ে মুক্তি বড়।
(গ) উদ্দীপকের পথচারীর আচরণে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলের বন্দি হওয়ার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে।
অর্থচিন্তা মানুষকে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে নিয়ে যায়। অর্থসাধনাকে জীবনসাধনা করলে মানুষের জীবন সঠিক পথ খুঁজে পাবে না। বরং অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে। এতে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক সব ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। উদ্দীপকে একটি সড়ক দুর্ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে মানুষ আহত ও নিহত হয়েছে। এমতাবস্থায় একজন পথচারী দুর্ঘটনা কবলিত যাত্রীদের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যায়। পথচারী ব্যক্তি লোভের বশবর্তী হয়ে অমানবিক কাজ করেছে। অর্থচিন্তায় মগ্ন হয়েই সে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধেও অর্থচিন্তার নিগড়ে মানুষের বন্দি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিজেকে অর্থচিন্তা থেকে মুক্ত করতে না পারলে মানবজীবনে শিক্ষা সোনা ফলাতে পারবে না। ফলে শিক্ষার সুফল হবে ব্যক্তিগত। আর অধিকাংশ মানুষই যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। এমনই ঘটনার প্রতিফলন দেখা যায় উদ্দীপকে।
(ঘ) উদ্দীপকে উল্লিখিত শিক্ষক যেন ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধ লেখকের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিত্ব। মন্তব্যটি যথার্থ।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক হলো মনুষ্যত্ব। মনুষ্যত্ববোধে উন্নীত মানুষ কখনই কোনো মন্দ কাজে লিপ্ত হতে পারে না। বরং সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে।
উদ্দীপকে একটি সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলতে গিয়ে একজন স্কুল শিক্ষকের মানবিক আচরণের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। সেই শিক্ষক দুর্ঘটনায় পতিত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশকে খবর দিয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এখানে শিক্ষকের মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ ধরনের মানবিক মানুষই ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক প্রত্যাশা করেছেন।
‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটাতে বলেছেন। শিক্ষার আসল কাজ যে জ্ঞান পরিবেশন নয়, মূল্যবোধ সৃষ্টি তা এখানে বলা হয়েছে। তাই মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষে পরিণত হতে হবে। এতে মানুষ কেবল আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে না। লোভের ফাঁদে ধরা দেবে না। লেখকের এসব বক্তব্যের সার্থক রূপায়ণ ঘটেছে উদ্দীপকের শিক্ষকের মধ্যে। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটিকে যথার্থ বলা যায়।
(২) শাহেদ করিম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে টকশোতে কথার ফুলঝুরি ফুটত যার মুখে, শোনাতেন নীতিবাক্য। হাসপাতালের মালিক হিসেবে তিনি মানবহিতৈষী হিসেবে ফিরিস্তি দিতেন। করোনাকালে করোনা টেস্টের ভুয়া রেজাল্ট দিয়ে তার আসল পরিচয় ফুটিয়ে তোলেন। এরকম আরও অনেক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বর্তমানে কারাবাস করছেন তিনি।
(ক) অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও মুক্তি বড়- এই বোধটি কীসের পরিচায়ক?
(খ) ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে উল্লিখিত ক্ষুৎপিপাসার ব্যাপারটি মানবিক করে তোলা যায় কীভাবে? ব্যাখা কর।
(গ) উদ্দীপকের করোনা টেস্ট নিয়ে শাহেদ করিমের কর্মকাণ্ড ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের কোন দিকটিকে নির্দেশ করে? ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) ‘উদ্দীপকের প্রথম দিকে শাহেদ করিমের কথা অনুযায়ী যদি তার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো তবে তার জীবনেও সোনা ফলত।’ ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।
উত্তর
(ক) অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও মুক্তি বড়- এই বোধটি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচায়ক।
(খ) ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে উল্লিখিত ক্ষুৎপিপাসার ব্যাপারটিকে মানবিক করে তোলা যায় শিক্ষার দ্বারা।
মানবজীবনের দুটি সত্তা। একটি জীবসত্তা, অন্যটি মানবসত্তা। জীবসত্তার কাজ হলো ক্ষুৎপিপাসার দিকটিতে খেয়াল রাখা। জীবসত্তার তাগিদে মানুষ নানা ধরনের কাজ করে। সেই কাজের মধ্যে আবার শুদ্ধ ও অশুদ্ধ দুটি বিষয় থাকে। যারা প্রকৃত অর্থে শিক্ষা অর্জন করে তারা জীবসত্তার জন্য শুদ্ধতার চর্চা করে। তখন জীবসত্তার বিষয়টিও মানবিক হয়ে ওঠে। আর যারা প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে ব্যর্থ তারা ক্ষুৎপিপাসার ব্যবস্থা করতে পারলেই খুশি থাকে। সেখানে মানবিকতা বা শুদ্ধাশুদ্ধির কোনো বাছবিচার থাকে না। একমাত্র শিক্ষা অর্জন করেই ক্ষুৎপিপাসার বিষয়টি মানবিক করে তোলা যায়।
(গ) উদ্দীপকের করোনা টেস্ট নিয়ে শাহেদ করিমের কর্মকাণ্ড ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের জীবসত্তার দিকটিকে নির্দেশ করেছে।
একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে হলে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয়। মূল্যবোধ তৈরি করতে হয়। আর এই মনুষ্যত্ব অর্জিত হয় প্রকৃত শিক্ষার দ্বারা। মানুষ যখন অর্থচিন্তায় অধিক বেশি মগ্ন থাকে তখন প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে সে বাধাগ্রস্ত হয়।
‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে লেখক মানুষের দুটি সত্তার কথা বলেছেন। একটি জীবসত্তা, অন্যটি মানবসত্তা। মানুষ জীবসত্তা নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত থাকে যে অধিকাংশই মানবসত্তার ঘরে উন্নীত হতে পারে না। জীবসত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে তারা অর্থচিন্তার নিগড়ে বন্দি হয়ে পড়ে। উদ্দীপকের শাহেদ হাসপাতালের মালিক হিসেবে মানবহিতৈষী হিসেবে ফিরিস্তি দিতেন। কিন্তু করোনাকালে করোনা টেস্টের ভুয়া রেজাল্ট দিয়ে তার আসল পরিচয় ফুটিয়ে তোলেন। আসলে তিনি শিক্ষার আসল কাজ উপলব্ধি করতে পারেননি। অর্থাৎ তিনি প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেননি। তাই তো জনগণকে ঠকিয়ে তিনি তার ক্ষুৎপিপাসার বিষয়টি নিবারণ করেছেন, যা আসলে প্রবন্ধে উল্লিখিত জীবসত্তাকেই নির্দেশ করে। তাই বলা যায়, করোনা টেস্ট নিয়ে শাহেদ করিমের কর্মকাণ্ড আলোচ্য প্রবন্ধের জীবসত্তার দিকটিকে নির্দেশ করেছে।
(ঘ) “উদ্দীপকের প্রথম দিকে শাহেদ করিমের কথা অনুযায়ী যদি তার কর্মকান্ড পরিচালিত হতো তবে তার জীবনেও সোনা ফলত”-কথাটি যথার্থ।
শিক্ষা মানবজীবনের মানবসত্তায় উত্তরণের সোপান। মানুষ জীবনের প্রকৃত অর্থ তখনই বুঝতে পারে যখন সে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে। কিন্তু অধিকাংশ লোকাই প্রকৃত শিক্ষা লাভ করতে পারে না। ফলে, তারা যে অন্ধকারে ছিল সেই অন্ধকারেই থেকে যায়। মানুষ প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হলে সার্বিক উন্নতির পথ উন্মুক্ত হয়।
অধিকাংশ মানুষই শিক্ষাকে জীবনধারণের উপায় মনে করে। তারা ভাবে যে অর্থসাধনাই জীবনসাধনা। কিন্তু অর্থসাধনাই যে জীবনের সবটুকু নয়, এ বিষয়টি মানুষকে বোঝানো যায় না বলেই শিক্ষা তাদের জীবনে সোনা ফলাতে পারে না। উদ্দীপকের শাহেদ করিমের যে কর্মকাণ্ড তাতে এ কথা স্পষ্ট যে তার মধ্যে অর্থচিন্তাই সবচেয়ে বড়। তিনি আত্মতৃপ্তির চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। তাই তো শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি হয়েছে নির্মম।
শাহেদ করিম যদি তার টকশোর কথার মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময়- অবস্থান করতেন তাহলে তার জীবন হতো অন্য রকম। আর তার দ্বারা এ কাজ কখনই সম্ভব হতো না যখন শিক্ষার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারতেন। তিনি যদি প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতেন তাহলে অর্থচিন্তার নিগড় থেকে মুক্তি পেতেন। তিনি জীবসত্তা থেকে মানবসত্তায় উন্নীত হতেন। তিনি শিক্ষার প্রকৃত স্বাদ পেতেন বলে প্রাবন্ধিকের মতে তার জীবনে সোনা ফলত। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের প্রথম দিকে শাহেদ করিমের কথা অনুযায়ী যদি তার। কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো তবে তার জীবনেও সোনা ফলত।
(৩) একবার পাখোম নামক এক ব্যক্তিকে একটা সুযোগ দেয়া হলো, সন্ধ্যার আগে যে সীমানাটুকু সে ঘুরে আসতে পারবে, সেই পুরো জমিটাই তার হবে। শর্তানুসারে সে দৌড়াতে শুরু করল। যখন প্রায় সন্ধ্যা তখন সে দেখে, যে জায়গা থেকে সে রওয়ানা দিয়েছিল তার ধারে-কাছেও সে আসতে পারেনি। বরং প্রচন্ড তেষ্টা আর ক্লান্তি নিয়েই তার মৃত্যু হয়।
(ক) শিক্ষার আসল কাজ কী?
(খ) লেফাফাদুরস্তি আর শিক্ষা এক কথা নয় কেন? বুঝিয়ে লেখ।
(গ) উদ্দীপকের ‘পাখোম’ চরিত্র ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের কোন দিককে স্মরণ করিয়ে দেয়? ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) “পাখোমের মতো লোকদের মানসিকতা পরিবর্তনই ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের লেখকের মূল উদ্দেশ্য।”- মন্তব্যটির সত্যতা যাচাই কর।
উত্তর
(ক) শিক্ষার আসল কাজ মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।
(খ) লেফাফাদুরস্তি আর শিক্ষা এক কথা নয়- কারণ এ বিষয়টি শিক্ষার সঙ্গে মেলে না।
লেফাফাদুরস্তি হলো বাইরের দিক থেকে ত্রুটিহীনতা কিন্তু ভিতরে প্রতারণা। শিক্ষার আসল কাজ হলো মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, জ্ঞান পরিবেশন করা নয়। শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্ব লাভ করে মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। শিক্ষা মানুষকে মুক্তির সন্ধান দেয়। মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করায়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সংকীর্ণতার গণ্ডি অতিক্রম করে বৃহতের দিকে যাত্রা করে। শিক্ষা মানুষের মনকে আলোকিত করে, ভিতরকে জাগিয়ে তোলে। অন্যদিকে লেফাফাদুরস্তির মাধ্যমে মানুষ কেবল বাহ্যিক বিষয় সম্পর্কে কিছু ধারণা পেতে পারে, মনুষ্যত্বলোকের সন্ধান পায় না। এসব কারণেই লেখক বলেছেন লেফাফাদুরস্তি আর শিক্ষা এক নয়।
(গ) উদ্দীপকের পাখোম চরিত্র ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের জীবসত্তার ঘরের বিশৃঙ্খল দিকটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মানুষের দুটি সত্তা- একটি তার জীবসত্তা, অপরটি মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব। মানুষ তার জীবসত্তার কারণে অন্ন-বস্ত্রের চিন্তায় হামেশা ব্যস্ত। অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দি। আমরা মানবসত্তার চেয়ে জীবসত্তাকে টিকিয়ে রাখতে অধিক মনোযোগী। ফলে অর্থচিন্তা আমাদের সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখে। অর্থচিন্তায় ব্যস্ত মানুষ নিজের করুণ পরিণতি ডেকে আনে।
উদ্দীপকের পাখোম অর্থচিন্তার নিগড়ে বন্দি।’ তাই জীবসত্তার ঘরের বিশৃঙ্খল অবস্থা তার করুণ পরিণতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত লোভের কারণে সে জমি তো পায়নি, বরং প্রচণ্ড তেষ্টা আর ক্লান্তি নিয়ে নিজের মৃত্যুকে বরণ করেছে। ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধেও বলা হয়েছে অর্থচিন্তার নিগড়ে সবাই বন্দি। ধনী-দরিদ্র সবারই অন্তরে একই ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে- চাই, চাই, আরও চাই। অর্থসাধনাই যে জীবনসাধনা নয় এ কথা ভালোভাবে উপলব্ধি না করতে পারলে মানবজীবন করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত হবে। তাই বলা যায়, ‘পাখোম’ চরিত্রের করুণ পরিণতি ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের জীবসত্তার ঘরের বিশৃঙ্খল দিকটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
(ঘ) “পাখোমের মতো লোকদের মানসিকতা পরিবর্তনই ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
শিক্ষা মানুষের প্রয়োজন পূরণের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। আর দশটি প্রাণীর মতো মানুষেরও ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তির প্রয়োজন আছে। কিন্তু অতিরিক্ত লোভের কারণে মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে। লোভের ফলে মনুষ্যত্বের পতন থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষার স্বাদ আস্বাদন করে মনুষ্যত্ব অর্জন করা।
উদ্দীপকের পাখোমের মানসিকতায় লোভের দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে। অতিরিক্ত জমি পাওয়ার আশায় তার জীবনে করুণ পরিণতি নেমে এসেছে। বরং প্রচণ্ড তেষ্টা আর ক্লান্তি নিয়ে মৃত্যু ঘটে পাখোমের। ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, লোভ মানুষের মনুষ্যত্বের অবনমন করে, পতন ঘটায়। শিক্ষা-দীক্ষার ফলে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’ কথাটা বুলিমাত্র নয়, সত্য। লোভের ফলে মানুষের আত্মিক মৃত্যু ঘটে, অনুভূতির জগতে সে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। শিক্ষা মানুষকে সে কথা জানিয়ে দেয় বলে মানুষ লোভের ফাঁদে ধরা দিতে ভয় পায়।
‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে লেখক শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন। উদ্দীপকের পাখোম লোভের কারণেই করুণ পরিণতির শিকার হয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করা। শিক্ষা মানুষের মনের মাঝে মূল্যবোধ সৃষ্টি করে। মানুষকে জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে পৌঁছে দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আলোচ্য প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য পাখোমের মতো লোকদের মানসিকতার পরিবর্তন। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
(৪) সরকারি অফিসে জনৈক কর্মকর্তা অল্প কয়েকদিন হলো চাকুরিতে যোগদান করেছেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনি ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন এবং দোষী প্রমাণিত হন। উল্লেখ থাকে যে, “শিক্ষাজীবনে তিনি যে অন্যায় ও দুর্নীতিবিরোধী শপথ নিয়েছিলেন তা আজ বেমালুম ভুলে গেলেন।”
(ক) শিক্ষার অন্যতম কাজ কী?
(খ) লেখক ‘নিচের থেকে ঠেলা’ বলতে কী বুঝিয়েছেন?
(গ) উদ্দীপকের কর্মকর্তার চরিত্রে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের যে দিকটি ফুটে উঠেছে তা ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) “উদ্দীপকের কর্মকর্তার চরিত্রে শিক্ষার অপ্রয়োজনীয় দিকটি অনুপস্থিত।”- মন্তব্যটি ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের আলোকে বিশ্লেষণ কর।
উত্তর
(ক) শিক্ষার অন্যতম কাজ হচ্ছে মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।
(খ) লেখক ‘নিচের থেকে ঠেলা’ বলতে সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন।
‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে লেখক দুটি সত্তার কথা বলেছেন- একটি জীবসত্তা, অন্যটি মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব। শিক্ষার মাধ্যমে এই মনুষ্যত্ব অর্জিত হয়। মনুষ্যত্বের বিকাশ না ঘটলে মানবকল্যাণ সাধিত হয় না। শিক্ষা মানুষকে মূল্যবোধ লাভ করতে সাহায্য করে, আবার অন্ন-বস্ত্রের সমস্যার সমাধান সহজ করে দেয়। কোনো ভারী জিনিসকে উপরে তুলতে চাইলে সেটাকে নিচ থেকে ঠেলতে হয়, আবার উপর থেকে টানতে হয়। মানব উন্নয়নের ব্যাপারে শিক্ষার সেই উপর থেকে টানা আর সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা নিচে থেকে ঠেলা। নিচের ঠেলা ছাড়াও জিনিস উপরে উঠানো যায়, তবে তা অধিক কষ্টসাধ্য। তাই সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠলে শিক্ষার ফসল যত সহজে লাভ করা যায় তা বিশঙ্খল সমাজে পাওয়া যায় না।
(গ) উদ্দীপকের কর্মকর্তার চরিত্রে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের জীবসত্তার দিকটি ফুটে উঠেছে।
শিক্ষা হচ্ছে জীবসত্তা থেকে মানবসত্তায় উত্তরণের উপায়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। মনুষ্যত্ব অর্জিত না হলে মানুষ লোভী থেকে যায় এবং জীবসত্তার প্রতি বেশি তৎপর হয়। আর মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষ নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের কল্যাণে নিরলস কাজ করেন।
উদ্দীপকে সরকারি অফিসের একজন কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকান্ডের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষাজীবনে অন্যায়বিরোধ ও দুর্নীতিবিরোধী শপথ নিলেও এই কর্মকর্তাই চাকরিতে যোগদানের পর তা ভুলে গিয়ে ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার এই লোভী মানসিকতা এবং অর্থ উপার্জনের জন্য অসৎ পথে যাওয়া মনুষ্যত্ববর্জিত এবং মানবকল্যাণ সাধনের বিপরীত। তার এসব কর্মতৎপরতা ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের আলোচিত জীবসত্তার প্রতি অনুরাগীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। অন্যায় না করার শপথ নিয়েও তিনি অন্যায় থেকে দূরে থাকতে পারেননি। তার শিক্ষায় জীবসত্তার দিকট্রির প্রকাশ পেলেও মানবসত্তা বা মনুষ্যত্বের দিকটির বিকাশ ঘটেনি। ফলে অন্যায়ভাবে টাকা উপার্জনের পথে তিনি পা বাড়িয়েছেন। এখানে তাঁর অর্থলোভী মানসিকতার দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
(ঘ) “উদ্দীপকের কর্মকর্তার চরিত্রে শিক্ষার অপ্রয়োজনীয় দিকটি অনুপস্থিত।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
শিক্ষা মানুষের সার্বিক উন্নতি সাধন করে। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের আত্মার মুক্তিদান করে। আত্মপ্রকাশের সুযোগ দান করে মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। তাতে মানুষ অর্থচিন্তার নিগড় থেকে মুক্তিলাভ করে মানবসত্তায় উন্নীত হয়।
‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে লেখক শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি শিক্ষার দুটি সত্তার কথা বলেছেন-জীবসত্তা ও মানবসত্তা। জীবসত্তা মানুষের মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতির সন্ধান দেয়। আর মানবসত্তা মানুষকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণের আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তি দিয়ে মনুষ্যত্বলোকের সন্ধান দেয়। মনুষ্যত্ব দ্বারা মানুষ নিজেকে অন্যান্য প্রাণী থেকে উন্নত হওয়ার ধারণা লাভ করে। উদ্দীপকের কর্মকর্তার চরিত্রে এই মানবসত্তার দিকটি অনুপস্থিত। শিক্ষার দুটি দিকের মধ্যে জীবসত্তার বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ পেয়েছে তার মধ্যে। মানবসত্তা বা মনুষ্যত্বের কোনো বিকাশ ঘটেনি। ফলে তিনি ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। তার মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনের দিকটি প্রকাশ পেয়েছে।
‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে লেখক শিক্ষার প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় উভয় দিকের আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে তিনি শিক্ষার অপ্রয়োজনের দিকটিকে শ্রেষ্ঠ দিক বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ দিকটি মানুষের মনকে বিকশিত করে, মনুষ্যত্ব অর্জনে সহায়তা করে, জীবনকে উপভোগ করতে শেখায়। এ দিকটির মাধ্যমেই মানুষ অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করতে পারে। উদ্দীপকে এ দিকের বিষয় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়নি। জনৈক কর্মকর্তার চরিত্রে যে দিকটি প্রকাশ পেয়েছে, তা এটির বিপরীত। এই দিকটি তার চরিত্রে প্রতিফলিত হলে তিনি অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জনের পথে যেতেন না। আত্মার উন্নতি ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটেনি বলেই তিনি শিক্ষার প্রয়োজনের দিকটির প্রতি ঝুঁকেছেন। এসব দিক বিচারে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।