উপন্যাস
১৯৭১
এসএসসি ২০২৬
প্রশ্ন: “দাদা, বড়ো ভয় লাগে!” উক্তিটি প্রসঙ্গসহ ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: “দাদা, বড়ো ভয় লাগে!”- এ কথাটি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনার ছোটো ভাই বিরু বলেছিল। মনা চিত্রা বুড়ির ছেলেকে খুন করে। তাই চিত্রা বুড়ির অভিযোগের ভিত্তিতে মেজর এজাজ মনাকে সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে শাস্তি দিতে চায়। মনাকে যখন শাস্তি দেওয়ার জন্য বিলের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তার সঙ্গে এগারো বছরের ছোটো ভাই বিরুও যায়। বিরু ছোটো হলেও বুঝতে পারে তার ভাইকে মিলিটারিরা মেরে ফেলবে। তাই সে মনার লুঙ্গির এক প্রান্ত শক্ত করে ধরে রাখে। একপর্যায়ে মেজর এজাজ নিষ্ঠুরতার একটা নমুনা দেখানোর জন্য বিরুকেও মনার সঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করার নির্দেশ দেয়। রাজাকাররা মনা আর বিরুকে ঠেলে পানিতে নামিয়ে দেয়। বিরু তার ভাইয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে রাখে। সে থরথর করে কাঁপতে থাকে। রাইফেল তাক করামাত্র বিরু চিৎকার করে তার ভাইকে বলতে থাকে যে, তার ভয় লাগছে। বিরু তার ভয় বোঝাতেই প্রশ্নোক্ত কথাটি তার ভাই মনাকে বলে।
প্রশ্ন: ‘১৯৭১’ উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের মসজিদের ইমাম নিপীড়িত বাঙালির প্রতীক।-মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ‘১৯৭১’ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ গ্রামীণ বাংলার প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহকে শিল্পিতভাবে উপস্থাপন করেছেন। পাকিস্তানি মিলিটারি নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে, ক্যাম্প স্থাপন করে এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এ উপন্যাসে মসজিদের ইমাম সাহেব একটি নির্বিরোধী চরিত্র। তিনি গ্রামের মসজিদে থাকেন এবং গ্রামের জয়নাল মিয়া ও অন্যদের বাড়িতে খাবার খান। গ্রামে মিলিটারি প্রবেশের বিষয়টি প্রথমে নজরে আসে ইমাম সাহেবের। মিলিটারি মেজরের নির্দেশে ইমাম সাহেবকে ধরে নিয়ে আসা হয় ক্যাম্পে। অত্যন্ত ধর্মভীরু ও নিরীহ এ মানুষটি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে আটক হয়ে চরম বিচলিত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে সেনারা নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টারকে ধরে নিয়ে আসে। তিনি টিচার্স রুমে এসে ইমামকে রক্তাক্ত ও শারীরিকভাবে নির্যাতিত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে ইমাম সাহেবের নাক-মুখ ফুলে গেছে, ঠোঁট কেটে গেছে, পাঞ্জাবিতে রক্তের দাগ এবং কাটা ঠোঁট দিয়ে হলুদ রঙের রস বের হচ্ছে। পাকিস্তানি সেনারা মুসলমান হওয়ায় তারা সাচ্চা মুসলিমদের ক্ষতি করে না বলে যে বিশ্বাস বাঙালিদের মনে ছিল তা ভূলুণ্ঠিত হয় ইমামের চরম নির্যাতিত অবস্থার মাধ্যমে। অর্থাৎ তারা নিরপরাধ মানুষের প্রতিও নির্দয় আচরণ করেছে।
মেজরের ধারণা ছিল গ্রামের ইমাম সাহেব মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য জানেন। তাই তাকে নির্যাতন করে তথ্য বের করার চেষ্টা করে তারা। মনা ও বিরুকে হত্যা করে ইমামের মনে ত্রাসের সঞ্চার করার চেষ্টা করা হয়। ইমাম সাহেবকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে তিনি মেজরের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেন না এবং তার প্রশ্নের বাণে ক্ষতবিক্ষত হন। মেজরের উপর্যুপরি আঘাতের পরও তিনি পাকিস্তানের পক্ষে সাফাই গাননি। তিনি বিপদ থেকে পরিত্রাণ কামনা করলেও নিজের দেশমাতৃকার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। ইমাম সাহেব আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মানুষ হলেও পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের মুখে নতি স্বীকার করেননি কিংবা নিজের মুক্তির জন্য তাদের অনুগ্রহ কামনা করেননি। পাকিস্তানিরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে নিপীড়ন চালিয়েছে তা থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কেউ রেহাই পায়নি। গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবকে তারা ধর্মের কারণে ছাড় দেয়নি, বরং চরম নির্যাতন করেছে। ইমাম সাহেব চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন শুধু বাঙালি হওয়ার কারণে। ‘১৯৭১’ উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের উপর হানাদার বাহিনীর সর্বব্যাপী আগ্রাসনের চিত্র অঙ্কন করেছেন যা ইমাম সাহেবের মতো চরিত্রগুলোর মাধ্যমে উঠে এসেছে। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, ‘১৯৭১’ উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের মসজিদের ইমাম নিপীড়িত বাঙালির প্রতীক।- মন্তব্যটি যথার্থ।
প্রশ্ন: জয়নাল মিয়া দলবল নিয়ে ছাতিম গাছের নিচে অপেক্ষা করে কেন?
উত্তর: ‘১৯৭১’ উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করে ১৯৭১ সালের পহেলা মে তারিখে। পাকিস্তানি মিলিটারি নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলঘরে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। স্কুলের দপ্তরি ও দারোয়ান রাসমোহনের মাধ্যমে তারা আজিজ মাস্টারের কাছে খবর পাঠায় দেখা করার জন্য। কিন্তু হাঁপানির রোগী আজিজ মাস্টার একা মিলিটারির সাথে দেখা করতে যাওয়ার সাহস পায়নি। তাই ছয়জনের একটি দল পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে স্কুলে মিলিটারিদের সাথে দেখা করতে যায়। কিন্তু মিলিটারি মেজর এজাজ আহমেদ আজিজ মাস্টার বাদে বাকি সবাইকে স্কুল থেকে চলে যেতে বলেন। তখন ছয়জনের দলের মধ্যে জয়নাল মিয়াসহ পাঁচজন স্কুল থেকে ফিরে গিয়ে ছাতিম গাছের নিচে আজিজ মাস্টারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
প্রশ্ন: রফিক চরিত্রটিকে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে পড়ার নিগূঢ় আমন্ত্রণ রয়েছে ‘১৯৭১‘ উপন্যাসে- এ প্রসঙ্গে মতামত দাও।
উত্তর: ‘১৯৭১’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হচ্ছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। নীলগঞ্জ গ্রামের পটভূমিতে এ উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কিছু খন্ডচিত্র। উপন্যাসের কাহিনি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় পুরো উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে মেজর এজাজ আহমেদকে কেন্দ্র করে। তার গতিশীলতার সাথে উপন্যাসের কাহিনিও গতি লাভকরেছে। তবে উপন্যাসের গভীরে প্রবেশ করলে লক্ষ করা যায়, উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল চরিত্র হচ্ছে রফিক। উপন্যাসে রফিক মেজর এজাজ আহমেদের সহযোগী। পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে থেকেও সে কাজ করে গেছে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে। বিভিন্ন সময়ে মেজর এজাজ আহমেদের বিরোধিতা করে হয়ে উঠেছে প্রতিবাদী চরিত্র। তবে শেষ পর্যন্ত লেখক রফিক চরিত্রের গূঢ় তত্ত্ব রেখে দিয়েছেন ধোঁয়াশার মধ্যেই। তাই রফিক চরিত্রটিকে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয়।
‘১৯৭১’ উপন্যাসে আমরা রফিক চরিত্র সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি আজিজ মাস্টারের দৃষ্টিকোণ থেকে। আজিজ মাস্টার স্কুলঘরে মিলিটারির সাথে দেখা করতে গেলে মেজর এজাজ আহমেদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা রফিকের বর্ণনা এসেছে এভাবে- লোকটি রোগা ও বাঙালির মতো। যার গায়ে আছে চকচকে নীল রঙের একটি শার্ট। লোকটি খুব ঘামছে এবং ময়লা একটা রুমালে ক্রমাগত ঘাড় মুছছে। প্রথম সাক্ষাতে রফিকের সম্পর্কে এতটুকুই জানতে পারা যায়। পরবর্তীতে উপন্যাসের শেষদিকে গিয়ে ইমাম সাহেবের করা প্রশ্নের উত্তরে পাঠক জানতে পারেন নীল শার্ট পরিহিত ব্যক্তির নাম রফিক। রফিক নীলগঞ্জ গ্রামে আগে কখনো আসেনি। কিন্তু তার সম্পর্কে লেখক বর্ণনা করেছেন, সে হাঁটছে মাথা নিচু করে। এমনভাবে হাঁটছে যেন পথঘাট ভালো চেনা। লেখক বর্ণনার মধ্য দিয়েই ক্রমান্বয়ে রফিক চরিত্রকে করে তুলেছেন রহস্যময়।
উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, উপন্যাসের সর্বাধিক জটিল চরিত্র হচ্ছে রফিক। তাকে বাস্তব হিসেবে না পড়ে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে পড়াই শ্রেয়। উপন্যাসে লেখক পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, রফিক কখনো নীলগঞ্জ গ্রামে আসেনি অথচ সে এমনভাবে কাজ করেছে যেন শুধু এ গ্রামের রাস্তাঘাট নয়, মানুষজন এবং প্রাকৃতিক অবকাঠামোও তার খুবই চেনা। ইমাম সাহেব তার কাছে জানতে চান যে, সে কোন এলাকার মানুষ। কিন্তু রফিক কোনো জবাব দেয়নি। মেজর এজাজ আহমেদের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও ‘আমরা’ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে রফিক। সেই সাথে হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের যেকোনো গ্রামের যেকোনো রফিক।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে পরিশেষে আমরা একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, রফিক চরিত্রটিকে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে পড়ার নিগূঢ় আমন্ত্রণ রয়েছে ‘১৯৭১’ উপন্যাসে।
প্রশ্ন: মীর আলী অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে কেন?
উত্তর: গভীর রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মীর আলি ছেলের অপেক্ষা করতে করতে একসময় বিছানাতেই প্রস্রাব করে ফেলে। এতে বিছানার একাংশ ভিজে যায়। এর আগে কখনই তার সাথে এমন ঘটেনি। যার ফলে মীর আলি অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে। মীর আলি সত্তর বছর বয়সি বৃদ্ধ মানুষ। তার কাছে বুড়ো বয়সের সবচেয়ে যন্ত্রণা রাত-দুপুরে বাইরে যেতে হয়। কিন্তু সে একা একা যেতে পারে না। অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হয়। এমনই একদিন গভীর রাতে তার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। শুরুতে তার পুত্রবধূ অনুফা তাকে সাহায্য করে এবং সে বাইরে যায়। কিন্তু কিছু সময় পর তার আবার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। ছেলেকে ডাকলেও সে আসতে দেরি করায় একসময় মীর আলি অজান্তেই বিছানায় মূত্রত্যাগ করে। আর এটাই তাকে অত্যন্ত বিচলিত বোধ করায়।
প্রশ্ন: “অনুফা এ সংসারে ভাগ্য নিয়ে এসেছে”- উক্তিটি পর্যালোচনা করো।
উত্তর: ‘১৯৭১’ হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার প্রামাণ্য দলিল যেন এই উপন্যাসটি। ‘১৯৭১’ উপন্যাসের আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে নীলগঞ্জ গ্রামকে কেন্দ্র করে। নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারির আগমন ও নৃশংসতা আলোচ্য উপন্যাসের প্রধান বিষয় হলেও লেখক প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনাচার, তাদের বিশ্বাস এই বিষয়গুলোও তুলে ধরেছেন। নীলগঞ্জ গ্রামের অবস্থা খুবই অনুন্নত। সেই গ্রামে রয়েছে শ্রীহীন চল্লিশ-পঞ্চাশটি ঘর। গ্রামের অন্যতম একজন বাসিন্দা হলো মীর আলি। মীর আলির পুত্রবধূ হলো অনুফা, বদিউজ্জামানের স্ত্রী সে।
মীর আলি আলোচ্য উপন্যাসের বয়োবৃদ্ধ চরিত্র। গ্রামীণ বৃদ্ধ ব্যক্তির প্রতিনিধি হিসেবে লেখক তাকে অঙ্কন করেছেন। গ্রামের বৃদ্ধদের মধ্যে যেমন নানা সংস্কার ও বিশ্বাস থাকে, মীর আলির মধ্যেও তাই।
“অনুফা এ সংসারে ভাগ্য নিয়ে এসেছে”- উক্তিটি মূলত মীর আলির মনের ভাবনা। একদিন কাশির মাঝে চা খেতে খুব ইচ্ছে করলে অনুফা মীর আলিকে চা করে দেয়। আর এতেই তার প্রতি মমত্ববোধ বেড়ে যায় মীর আলির। আর তখনই এ উক্তিটির জন্ম।
মীর আলির মতে, অনুফার বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে সংসারের যাবতীয় মঙ্গল সাধিত হয়েছে, যা পূর্বে হয়নি। সংসারের আয়-উন্নতি বেড়েছে। নতুন সাইকেল আছে, নতুন চামচ আছে। তাকে গত বছর নতুন লেপ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মীর আলির মনে পড়ে, অনুফা আসার পর থেকে তাদের পরিবার এমন কোনো দিন ছিল না যে তারা এক বেলা না খেয়ে থেকেছে।
উপর্যুক্ত কথাগুলো হলো এক বৃদ্ধ লোকের তার পুত্রবধূর সম্পর্কে হঠাৎ মমত্ববোধ জেগে ওঠায় যে ধারণা বা ভাবনা, তার প্রস্ফুটন। এটাই মীর আলির বিশ্বাস। মীর আলির এই বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ বৃদ্ধদের বিশ্বাসের দিকটি প্রতীয়মান হয়েছে। সুলক্ষণ ও কুলক্ষণ কেন্দ্রিক নানা বিশ্বাস গ্রামে প্রচলিত থাকে। মীর আলির অনুফাকে নিয়ে করা প্রশ্নোক্ত কথাটির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন পুত্রবধূর প্রতি মমত্ববোধের প্রকাশ অন্যদিকে তেমন নীলগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দাদের সংস্কার ও বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটেছে।
প্রশ্ন: হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১‘ উপন্যাসটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ইতিহাস জানার জন্য হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’ উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ।
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘১৯৭১’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি উপন্যাস। তিনি এ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। এ উপন্যাসে লেখক ছক কষে কষে মাটি-মানুষ ও প্রাকৃতিক অবকাঠামো এঁকে বাংলার এক নিভৃত গ্রামকে যুদ্ধের ময়দান বানিয়ে তুলেছেন। ইতিহাস দ্বারা স্বীকৃত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতি পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন, জ্বালাও-পোড়াও, ধর্মের ভিত্তিতে জাতিগত শোষণ-নিপীড়নের বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দিয়েছেন যুক্তির সূক্ষ্ম ব্যবহারে। সেই সাথে ভীতসন্ত্রস্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে সাহসিকতার সঞ্চার ও প্রতিবাদী মনোভাব বাঙালির সুনিশ্চিত বিজয়ের ইঙ্গিত দেয়। তাই মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক পাঠের জন্য হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’ উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলোর সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।
উত্তর: প্রত্যেক জাতির জাতিগত ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে তাদের মুক্তিসংগ্রাম গুরুত্ব পেয়েছে। নানা দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত হয়েছে সেই বিজয়গাথার ইতিহাস। কবি-সাহিত্যিকরা সেই ইতিহাসের বাস্তব ভূমিতে দাঁড়িয়ে তাদের সেই গৌরবগাথা থেকে সৃষ্টি করেছেন কাব্য-উপন্যাস গল্প-নাটক। বাঙালি জাতির জীবনে তেমনই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’ উপন্যাস বাঙালির সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসেরই বাস্তব রূপায়ণ।
‘১৯৭১’ উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টিতে হুমায়ূন আহমেদ বাস্তবধর্মী নির্মোহ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এ উপন্যাসের প্রধান-অপ্রধান, নায়ক-খল কিংবা কেন্দ্রীয় ও পার্শ্ব- সকল চরিত্রের কর্মকাণ্ড ও মনোভাব সূক্ষ্ম কার্যকরণ সম্পর্কে যুক্ত। এক্ষেত্রে লেখক মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থানকারী পাকিস্তানি মেজরকেও বাস্তবতার নিরিখে নির্মাণ করেছেন।
‘১৯৭১’ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর কর্মকাণ্ড তাদের সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তব সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ উপন্যাসের প্রধান ও খল চরিত্র মেজর এজাজ, যিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমির কৃতী ক্যাডেট, বাড়ি পেশোয়ারের অখ্যাত এক গ্রাম রেশোবাতে। এই মেজরের চরিত্রচিত্রণেও লেখক নিরাসক্তি ও সুমিতির ব্যাপারে প্রত্যয়ী। লেখক বলে দিচ্ছেন, রেশোবা গ্রামে মীর আলির সমবয়সি বৃদ্ধ পিতা আছে তার। এজন্য এজাজ বৃদ্ধ মীর আলিকে সালাম জানিয়েছে। মেজর এজাজ বাঙালিদের ওপর যে অত্যাচার করেছে, সেটিও তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যেই এ উপন্যাসের নানা চরিত্রের মানসিকতা ও বিশ্বাসের বিবর্তন বাস্তবতার সহযোগে উপস্থাপন করেছেন লেখক হুমায়ূন আহমেদ। এমন একটি বিবর্তমান চরিত্র সফদরউল্লাহ।
‘১৯৭১’ উপন্যাসের সফদরউল্লাহ একটি অপ্রধান চরিত্র। গ্রামের সাধারণ মানুষ নীলগঞ্জে মিলিটারির আগমনে তটস্থ। ঘরে তার স্ত্রী ও কিশোরী শ্যালিকাকে নিয়ে ভয় ছিল তার। তাই সে গ্রামের সম্পদশালী ব্যক্তি জয়নাল মিয়ার কাছে স্ত্রী-শ্যালিকাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করতে আসে। কিন্তু জয়নাল মিয়া জানায়, মিলিটারিরা মুসলিমদের ক্ষতি করে না। জয়নাল মিয়ার অভয়বাণী সফদরউল্লাহকে সাহস জোগায়।
সফদরউল্লাহর অনুপস্থিতিতে ঝড়ের সময় এক মিলিটারি সুবাদার ও তিনজন রাজাকারের একটি ছোটো দল তার বাড়িতে প্রবেশ করে তার স্ত্রী ও শ্যালিকাকে দেখতে পায়। পুরুষহীন নির্জন বাড়িতে স্ত্রী লোকদের নির্যাতন করার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এতে সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকা নির্যাতনের শিকার হয়।
বাড়ি ফিরে সফদরউল্লাহ নির্যাতিত স্ত্রী ও শ্যালিকাকে দেখে তার মানসিক পরিবর্তন ঘটে। মিলিটারি ও রাজাকারদের প্রতি সে ক্ষিপ্ত হয়। হাতে দা নিয়ে সশস্ত্র সফদরউল্লাহ রাজাকার ও মিলিটারি সুবাদারকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুঁজতে গভীর রাতে রওয়ানা হয়। সফদরউল্লাহ নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদী হয়ে ওঠার প্রতীকী চরিত্র। এ চরিত্রের মাধ্যমে লেখক বাঙালির প্রতবাদী সত্তা প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্ন: ‘১৯৭১‘ উপন্যাসটি কীভাবে ১৯৭১ সালের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে?
উত্তর: ‘১৯৭১’ উপন্যাসটি বিভিন্ন দিক থেকে ১৯৭১ সালের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে।
‘১৯৭১’ সালের ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপরে নির্মিত ‘১৯৭১’ উপন্যাসটি। এ উপন্যাসে বিভিন্ন দিক থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনী হত্যাকাণ্ডের প্রথম শিকার হয়েছে ‘১৯৭১’ উপন্যাসের নীলু সেন। পাক হানাদার বাহিনী তাকে গভীর রাতে গুলি করে হত্যা করে। পাকবাহিনী ও রাজাকারদের পাশবিক নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্ত ‘১৯৭১’ উপন্যাসের সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও কিশোরী শ্যালিকা। পাকবাহিনীর অকথ্য নির্যাতন ও অপমানজনক শাস্তির দৃষ্টান্ত এ উপন্যাসের ইমাম সাহেব ও আজিজ মাস্টার। পাকবাহিনীর নির্বিচারে গ্রাম পোড়ানোর শিকার কৈবর্তপাড়া। তাই বলা যায়, বিভিন্ন দিক থেকে ‘১৯৭১’ উপন্যাসটি ১৯৭১ সালের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন: সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তন ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রত্যেক জাতি নিজেদের স্বাধীনতার জন্য অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বাঙালির ত্যাগের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বাস্তবতার নিরিখে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সত্যকে তুলে ধরেছেন তার ‘১৯৭১’ উপন্যাসে। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধে মানুষের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামী চেতনার চিত্র বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে ‘১৯৭১’ উপন্যাসে।
‘১৯৭১’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র রফিক। উচ্চশিক্ষিত রফিক দোভাষীর কাজ পেয়ে মেজর এজাজের সঙ্গী হয়েছে। এ ধরনের চরিত্রের মধ্যে দ্বিচারিতার বিষয় থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রফিক সেসব থেকে অনেক দূরে। জাতিগত অবমাননার জের ধরে মেজর এজাজের সঙ্গে তার শত্রুতা। ব্যক্তিত্ববান রফিক শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিলেও বাঙালিত্বের অবমাননাকে প্রশ্রয় দেয়নি।
‘১৯৭১’ উপন্যাসে উল্লিখিত দুজন বিদেশি হলেন গ্রামের একমাত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টার ও মসজিদের ইমাম সাহেব। ভুল বোঝাবুঝির কারণে তারা মেজর এজাজের রোষে পড়েন। তবে তারা দুজনেই অত্যাচারের মুখেও অল্পট থেকেছেন। ব্যক্তিহীনতার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে অকাতরে প্রাণ দেন আজিজ মাস্টার।
নীলগঞ্জ গ্রামের দুজন গণমান্য ব্যক্তি হলেন নীলু সেন ও জয়নাল মিয়া। নীলু সেন ক্ষয়িষ্ণু জমিদারের শেষ উত্তরাধিকার। তিনি ব্যক্তিবান পুরুষ। নীলগঞ্জ গ্রামের প্রথম নিহত তিনি। জয়নাল মিয়া উঠতি সম্পদশালী ব্যক্তি। লোকটি মেরুদণ্ডহীন। তার মুখ দিয়েই লেখক মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নিশ্চিত করেন।
ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘১৯৭১’ উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে সৃষ্টি করেছেন সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থার নিরিখে। বয়স, শিক্ষা, পরিবেশ ও পরিস্থিতি চরিত্রগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রতিটি কর্মকান্ডের যৌক্তিক পারম্পর্য এঁকেছেন লেখক।
প্রশ্ন: রফিক চরিত্রের মাধ্যমে লেখক কী বার্তা দিতে চেয়েছেন?
উত্তর: রফিক চরিত্রের মাধ্যমে লেখক জাতিগত লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
‘১৯৭১’ উপন্যাসের রফিক একটি প্রতীকী চরিত্র। লেখক বলে দিচ্ছেন রফিক কখনো নীলগঞ্জ গ্রামে আসেনি। অথচ রফিক এমনভাবে চলাফেরা করে যেন এ গ্রামের অলিগলি সবকিছুই তার চেনা। পেশাগত জীবনে সে মিলিটারি কমান্ডার মেজর এজাজের দোভাষী। তবে পাকবাহিনীর প্রতি তার কোনোরূপ পক্ষপাত নেই। সে সব সময় ন্যায়কে ন্যায়, অন্যায়কে অন্যায় বলেছে। এক্ষেত্রে মৃত্যুও তাকে বাস্তবতা ও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আজিজ মাস্টারকে দেওয়া অপমানজনক শাস্তির বিরোধিতা করে সে মেজর এজাজের রোষে পড়ে। বাঙালির জাতিগত পরিচয় নিয়ে কটাক্ষের প্রতিবাদ করায় তার মৃত্যুদণ্ড দেয় মেজর এজাজ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও রফিক সত্যের জয়গান গেয়েছে।
প্রশ্ন: “১৯৭১’ উপন্যাসটি ছোটো হলেও মুক্তিযুদ্ধের বিশাল চেতনা ধারণ করে।”- উক্তিটির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বাংলাদেশের সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য। সাহিত্যের এ ভাগে উপন্যাসই জনপ্রিয়তার শীর্ষে। দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলমান পুরো ভূখণ্ডে বিস্তৃত পটকে ধারণ করা উপন্যাসের মতো বিশাল আয়তনের সাহিত্যধারার অনুকূলে হওয়ায় এ ধারায় উপন্যাসই পাঠকবহুল। হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’ উপন্যাসটি এক্ষেত্রে ভিন্নধর্মী। কেননা এ উপন্যাসের আয়তন বিস্তৃত নয়।
‘১৯৭১’ উপন্যাসের পৃষ্ঠাসংখ্যা ভূমিকাসহ সর্বমোট সাতান্ন যা নিতান্তই ক্ষুদ্র। তবে আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্তরকে স্পর্শ করেছে এটি।
নিস্তরঙ্গ গ্রাম নীলগঞ্জে মিলিটারির একটি দল প্রবেশ করে ১৯৭১ সালের পহেলা মে। মুক্তিযুদ্ধ তখনও এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের শোনা অনুষঙ্গ। তাই পুরো গ্রাম অপ্রস্তুত। সেই অপ্রস্তুত গ্রামে মিলিটারি হত্যাযজ্ঞ শুরুর মাধ্যমে প্রবেশ করে। গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি নীলু সেনকে গুলি করে হত্যা করে। গ্রামের মসজিদের ইমাম ও একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টারের মতো নিরীহ ভিনদেশিদের ওপর চালায় অকথ্য নির্যাতন। তাদের আতঙ্কিত করার লক্ষ্যে মনা কৈবর্ত ও তার ছোটো ভাইকে সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে। সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকাকে ধর্ষণ করে। কৈবর্তপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল এ খবর পাওয়ার পর পরই আগুনে পুড়িয়ে দেয় পুরো পাড়া।
হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে নীলগঞ্জ গ্রামের জনসাধারণও। ভীতু প্রকৃতির সফদরউল্লাহ দা হাতে নিয়ে মিলিটারি সুবাদার ও রাজাকারদের হত্যার উদ্দেশ্যে খোঁজে। আজিজ মাস্টার অপমানজনক শাস্তির পরিবর্তে মৃত্যুকে বেছে নেয়। বাঙালিদের প্রকৃতি নিয়ে কটাক্ষের প্রতিবাদ করে মৃত্যুবরণ করে রফিক। কৈবর্তপাড়ার সকলে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে গ্রাম ছেড়ে পালায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, আয়তনে ছোটো হলেও ‘১৯৭১’ উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্তরকে স্পর্শ করেছ। তাই আলোচ্য উক্তিটি যৌক্তিক।
প্রশ্ন: লেখক কীভাবে ভাষা ও সংলাপের মাধ্যমে সময়ের আবহ সৃষ্টি করেছেন?
উত্তর: লেখক দিন-তারিখ, মাস-বছর, ক্ষণের উল্লেখ করে ভাষা ও সংলাপের মাধ্যমে সময়ের আবহ সৃষ্টি করেছেন।
লেখক প্রথম পরিচ্ছেদ থেকেই সময়ের ব্যাপারে পাঠককে সচেতন করে দিয়েছেন। দিনটি ১৯৭১ সালের পহেলা মে। এ দিন মেজর এজাজ পঞ্চাশজন সৈন্যের একটি, ছোটো দল নিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করে। নিস্তরঙ্গ গ্রামে ভয়াবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রফিক ইমাম সাহেবের মুখ বারবার উচ্চারণ করিয়েছে “সময়টা এখন খারাপ”। মীর আলির সীমাহীন অন্ধকার চোখ বুঝতে পেরেছে বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণা। কিংবা আধঘণ্টাব্যাপী ঝড়ের পর সীমাহীন অন্ধকার, কোথাও বাতি জ্বলছে না। এভাবে লেখক দিন-তারিখ, মাস-বছর ও ক্ষণের নির্দিষ্ট ও অনির্দিষ্টতার সহযোগে ভাষা ও সংলাপের মাধ্যমে সময়ের আবহ সৃষ্টি করেছেন।
প্রশ্ন: উপন্যাসটির মাধ্যমে লেখক কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মকে দায়িত্ববোধে আহ্বান করেছেন? বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের নয় মাসব্যাপী চলমান এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ যুদ্ধের শহিদ হয়েছেন ত্রিশ লাখ মানুষ, দুলাখের অধিক নারী বিসর্জন দিয়েছে তাদের সম্ভ্রম। এসব মানুষের আত্মত্যাগ কখনো ভোলার নয়। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতা যুদ্ধের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার শিক্ষা দেয় ‘১৯৭১’ উপন্যাস।
হুমায়ূন আহমেদের ‘১৯৭১’ উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি বস্তুনিষ্ঠ পাঠ। এ উপন্যাসে লেখক বাস্তবতার নিরিখে ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। নীল সেনের অন্যায় হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এ উপন্যাসে পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সূচনা। একে একে হত্যার শিকার হয়েছে মনা, বিরু ও আজিজ মাস্টারদের মতো নিরীহ মানুষ এবং রফিকের মতো ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এছাড়াও পাকবাহিনী ও রাজাকারদের দ্বারা সম্ভ্রমহানির শিকার হয়েছে সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও কিশোরী শ্যালিকা। অকথ্য অত্যাচার চলেছে ইমাম সাহেবের ওপর। এতগুলো মানুষের হত্যাকাণ্ড-নির্যাতনই বলে দেয় যে, মুক্তিযুদ্ধ একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ত্যাগ ও গৌরবের দলিল। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষা দেয় ‘১৯৭১’ উপন্যাস। এ উপন্যাসের আত্মত্যাগী চরিত্র রফিক ও আজিজ মাস্টারের আদর্শ ধারণ করে দেশের কল্যাণে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো মনোবল নিয়ে অশুভ শক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। দেশের সংকটকালে, দেশের প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের বুকে মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রত্যয়ে নিরলস কাজ করতে হবে। এ উপন্যাসের মাধ্যমে লেখক মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মকে এভাবেই দায়িত্ববোধে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রশ্ন: আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি হয়েছিল মর্মান্তিক মৃত্যু। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এ দেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বাদ যাননি। আজিজ মাস্টার একজন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব কিন্তু ভীতু প্রকৃতির। নীলগঞ্জ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি গড়ার প্রথম দিনেই তাকে তলব করা হয়। তারপর থেকেই আজিজ মাস্টারসহ ইমাম সাহেবকে স্কুলের টিচার্স রুমে আটকে রেখে নানান অত্যাচার-নির্যাতন করে। কারণ সেনাদের ধারণা ছিল মাস্টার মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং সাহায্য করেছে। তাই তো মাস্টারকে অপমানজনক শাস্তি হিসেবে প্রথমে উলঙ্গ করে রাখে, তারপর তাকে গ্রামে ঘুরিয়ে আনার কথা বলে। কিন্তু সম্মানহানির চেয়ে মৃত্যুকে বরণ করা শ্রেয় মনে করায় আজিজ মাস্টার মেজরকে অনুরোধ করে যেন তাকে বিলের’ ধারে গুলি করে মারা হয়। শেষে হয়েছেও তাই। মাস্টার অপমান অথবা মৃত্যুর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বেছে নেয়।
প্রশ্ন: “নীলগঞ্জ যেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।”-বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক গৌবরময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। বিশ্বমানচিত্রে খুব কম জাতিরই এমন অর্জন রয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবোধের প্রথম সোপান রচিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। এরই ধারাবাহিকতায় নানা আন্দোলন-সংগ্রাম পেরিয়ে তারা উপনীত হয়েছিল মুক্তির সংগ্রামে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক অসংখ্য সাহিত্য রচনা করেছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। সেগুলোর মধ্যে ‘১৯৭১’ একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।
‘১৯৭১’ উপন্যাসে লেখক জনবিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র এক শান্ত গ্রামকে উপন্যাসের পটভূমি করেছেন। গ্রামটির নাম নীলগঞ্জ। এ গ্রামের মানুষ যুদ্ধ বোঝে না, সংগ্রাম কী তা জানে না। অথচ সেই গ্রামেই একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগমনে সেখানকার মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। লেখক স্পষ্ট করে কোথাও বলেননি যে নীলগঞ্জ গ্রামে মুক্তিবাহিনী আছে, শুধু সন্দেহের বেড়াজাল বুনে গেছেন উপন্যাসজুড়ে। সন্দেহের বশেই নীলগঞ্জ গ্রামে হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক মেজর এজাজের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়, যেটাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিচ্ছবি বলা যায়।
‘১৯৭১’ উপন্যাসের কাহিনিতে বলা হয়েছে নীলগঞ্জ গ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল জোয়ান পাকিস্তানি এক সেনাকে বন্দি করেছে, যার নাম মেজর বখতিয়ার। তাকে উদ্ধার করতেই মেজর এজাজ এ গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানের প্রথম থেকেই তারা গ্রামবাসীর ওপর আগ্রাসী হয়ে ওঠে। প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজকে ডেকে এনে অমানবিক অত্যাচার করে। একপর্যায়ে তারা তাকে গুলি করে হত্যা করে। শুধু এটিই নয়, তারা অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনা ঘটনায়। গ্রামবাসীকে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে কৈবর্ত মনা ও বিরুকে সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে। নীলগঞ্জের সম্ভ্রান্ত হিন্দু নীলু সেনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে হত্যা করে। বর্বর পাকিস্তানিরা দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যার যে নজির স্থাপন করেছিল নীলগঞ্জেও তাই ঘটেছে। মধুবনের জঙ্গলা মাঠের বিলকে তারা বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
শুধু পুরুষ নয়, দখলদার পিশাচ হানাদার বাহিনীর হাত থেকে গ্রামের মেয়েরাও রক্ষা পায়নি। সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকাকে তারা ধর্ষণ করে। মুক্তিযুদ্ধে নারী লাঞ্ছনার দিকটি এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে অন্যায় ও শোষণ কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ একসময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সফদরউল্লাহ তার স্ত্রী ও শ্যালিকার লাঞ্ছনার প্রতিশোধ নিতে দা হাতে বেরিয়ে পড়ে। আজিজ মাস্টার লজ্জাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং অপমানিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেয়। বিবেকের তাড়নায় ও প্রতিবাদস্বরূপ রফিক মেজর এজাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মৃত্যুবরণ করে। প্রত্যক্ষ কোনো প্রতিরোধ না হলেও এ উপন্যাসে দেশপ্রেমের চেতনাবোধ জাগ্রত হয় বেশকিছু চরিত্রে, যা মূলত বাংলাদেশে মুক্তিসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এছাড়াও এ দেশীয় রাজাকারদের উল্লেখ রয়েছে এ উপন্যাসে। তাই বলা যায়, ‘১৯৭১’ উপন্যাসের নীলগঞ্জ গ্রাম যেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন: খুনের বিচার করতে মেজর এজাজের এত আগ্রহী হওয়ার কারণ কী? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেব মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে রাজি হচ্ছিল না বলে মেজর তাদের সামনে মনা কৈবর্তের বিচার করতে চায়। মনা কৈবর্ত চিত্রা বুড়ির ছেলেকে খুন করেছিল। সেই খুনের বিচার গ্রামবাসী না করলে মেজর আজিজ করার আগ্রহ দেখায়। মনাকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিলে তার ছোটো ভাইকেও তার সঙ্গে হত্যা করা হয়। গ্রামবাসীর মনে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে যে ভালো মানসিকতার ভ্রান্ত ধারণা ছিল এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তা পালটে যায়। মূলত খুনের বিচার করা মেজর এজাজের একটা কৌশল ছিল মাত্র। এর দ্বারা মেজর আজিজ মূলত গ্রামবাসীর মনে তার সম্পর্কে ভীতি সঞ্চার করতে চেয়েছিল।