-
সুভা
বাংলা ১ম পত্র
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২’-এর উদ্বোধনী আসর অনুষ্ঠিত হয় কাতারের আলবাইত স্টেডিয়ামে। মঞ্চে আসেন দুহাতে ভর দিয়ে চলা বিশ বছরের যুবক গানিম আল, মুফতাহ। গানিমের সুললিত কণ্ঠে কোরআন তেলওয়াতের মাধ্যমে জমকালো আসর শুরু হয়। কে এই গানিম? জন্মগতভাবেই তাঁর দুটি পা নেই। এজন্য শিশুকাল থেকে তাঁকে পদে পদে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। তবে তাঁর মা-বাবা দুজন দুটি পা হয়ে সন্তানের সঙ্গে থেকেছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন। তাই তো তিনি বিশ্বের দরবারে একজন মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
(ক) বাঁখারি’ অর্থ কী?
(খ) সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে গেল কেন? বুঝিয়ে লেখ।
(গ) উদ্দীপকের গানিম ‘সুভা’ গল্পের সুভার সঙ্গে যে দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ তা ব্যাখ্যা কর।
(ঘ) “উদ্দীপকের গানিমের মতো প্রেরণা পেলে ‘সুভা’ গল্পের সুভার অবস্থারও পরিবর্তন হতো।”- মন্তব্যটি বিচার কর।
উত্তর:
(ক) বাঁখারি অর্থ কাঁধের দুদিকে দুপ্রান্তে ঝুলিয়ে বোঝা বহনের বাঁশের ফালি।
(খ) বিদেশযাত্রার উদ্যোগ হতে লাগল বলে সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে গেল।
‘সুভা’ গল্পের সুভা চরিত্রটি ছিল জন্ম থেকেই বোবা। বোবা হওয়ার কারণে তার পিতা-মাতা তাকে নিয়ে সারাক্ষণ বিচলিত থাকতেন। গৃহপালিত পশু ও বাড়ির বিড়াল শাবক ছিল তার বন্ধুর মতো। কিন্তু কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা বাণীকণ্ঠ সুভাকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিতে চান। সুভার যাওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না কিন্তু পিতা-মাতাকে বলতেও পারছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত যখন কলকাতায় যাওয়ার উদ্যোগ শুরু হলো তখন সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে গেল।
(গ) উদ্দীপকের গানিম ‘সুভা’ গল্পের সুভার সঙ্গে শারীরিক প্রতিবন্ধিতা ও সামাজিক বঞ্চনার দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ।
সুভা’ গল্পের প্রধান চরিত্র সুভা। সে জন্ম থেকেই বোবা। তার এই শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বাবা-মা বেশ চিন্তিত থাকেন। কারণ গল্পে দেখা যায় যে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সমাজ অবহেলার চোখে দেখে। তাই তো সুভার মা সুভাকে তার গর্ভের কলঙ্ক বলে জ্ঞান করেন। সে কারও কাছে কোনো সহানুভূতি পায় না। তার একমাত্র ভাষাসম্পন্ন বন্ধু ছিল প্রতাপ। তাকেও দেখা যায় সুভার অনুভূতি উপলব্ধি করতে চায় না। বোবা হওয়াটা যেন তার পাপ। তার ইচ্ছা, আবেগ, অনুভূতি, সিদ্ধান্ত কোনোকিছুরই কেউ তোয়াক্কা করে না।
উদ্দীপকের গানিমকেও দেখা যায় যে জন্মগতভাবে তাঁর পা দুটি নেই। এজন্য শিশুকাল থেকেই তাকে পদে পদে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার জন্য সেও সমাজে # কারও কাছে কোনো মূল্য পেত না। সমাজ তাকেও সব সময় ছোটো ও হীন করে দেখত, যার পুনরাবৃত্তি সুভা চরিত্রে আমরা পাই। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের গানিম ‘সুভা’ গল্পের সুভার সঙ্গে শারীরিক প্রতিবন্ধিতা ও সামাজিক বঞ্চনার দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ।
(ঘ) “উদ্দীপকের গানিমের মতো প্রেরণা পেলে ‘সুভা’ গল্পের সুভার অবস্থারও পরিবর্তন হতো।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেওয়া কোনো অপরাধ নয়। এটা প্রকৃতিরই এক লীলা। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পরিবারের লোকজন বোঝা মনে করে। তারাও যে আট-দশটা সাধারণ মানুষের মতো তা কেউ মানতেই চায় না। তারা কোনো কাজের নয়- এটা ভেবে তাদের সব সময় দূরে রাখা হয়। কিন্তু তারাও একটু বাড়তি যত্ন আর সুযোগ পেলে অসাধ্যকে সাধন করতে পারবে।
উদ্দীপকের গানিমকে দেখা যায় যে, জন্ম থেকেই তাঁর দুটি পা নেই। এজন্য শিশুকাল থেকে তাঁকে পদে পদে নানা লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু তাঁর বাবা-মা দুজন গানিমের দুটি পা হয়ে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। যার ফলে বিশ্ব দরবারে তিনি আজ মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।এটা সম্ভব হয়েছে শুধু পরিবার তাঁর পাশে ছিল বলে।
‘সুভা’ গল্পে সুভা চরিত্রের ক্ষেত্রে দেখা যায় ভিন্ন রূপ। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবার তাকে প্রেরণা না জুগিয়ে বরং আরও বোঝা – মনে করেছে। বিশেষ করে সুভার মা। অথচ বোবা কন্যার এই অবস্থায় মা অথবা বাবা যদি তার মুখের বুলি হতেন, তার আবেগ- অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করতেন তাহলে সমাজ তাকে এত তাচ্ছিল্য করতে পারত না। তার বাবা-মায়ের কাছেও এতটা বোঝা মনে হতো না। এমনকি প্রেরণা পেলে সুভার কোনো সুপ্ত প্রতিভাও হয়তো বিকশিত হতে পারত। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের গানিমের মতো প্রেরণা পেলে ‘সুভা’ গল্পের সুভার অবস্থারও পরিবর্তন হতো। সুতরাং মন্তব্যটি যথার্থ।
প্রশ্ন: একমাত্র সন্তান কাব্য বাকপ্রতিবন্ধী- বিষয়টি যখন জানলেন মিসেস শরীফা- একটুও ঘাবড়ালেন না; স্বামীকেও বোঝালেন। বাবা-মা’র পরম স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্নে বেড়ে উঠতে লাগল কাব্য। একদিন মা লক্ষ করলেন ছেলে আপন মনে কাগজে আঁকিবুঁকি করছে। তিনি বুঝে গেলেন মুখে ভাষা না থাকলেও তুলির আঁচড়েই সে একদিন বিশ্ব জয় করবে। স্বামীর সাথে পরামর্শ করে ছেলের আঁকাআঁকির জন্য যা যা করা দরকার সব করলেন। আজ দেশে-বিদেশে কাব্যে’র আঁকা ছবি প্রদর্শনী হচ্ছে; বিক্রি হচ্ছে বহু মূল্যে।
(ক) বাবা-মা’র কোন আয়োজন দেখে সুভার হৃদয় অশ্রু-বাষ্পে ভরে উঠেছিল?
(খ) ‘তুমি আমাকে যাইতে দিও না, মা’- সুভার এই অভিব্যক্তি বুঝিয়ে লেখ।
(গ) কাব্যে’র বাবা-মা’র সাথে ‘সুভা’ গল্পের বাবা-মা’র বৈসাদৃশ্য দেখাও।
(ঘ) উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিচর্যা পেলে কাব্যে’র মতো সুভা সমাজের একজন হয়ে উঠতে পারত- যুক্তি দাও।
উত্তর:
(ক) বাবা-মায়ের বিদেশযাত্রার আয়োজন দেখে সুভার হৃদয় অশ্রু- বাষ্পে ভরে উঠেছিল।
(খ) নিজের চিরচেনা জগৎকে আঁকড়ে ধরে সুভা প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছে।
বাকপ্রতিবন্ধী সুভাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার পিতা তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চান। কলকাতায় যাওয়ার আগের দিন সুভা তার চিরপরিচিত জগৎ নদীতীরে এসে লুটিয়ে পড়ে। দুই বাহু প্রসারিত করে সে যেন ধরণিকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কারণ সে তার এই চিরচেনা প্রকৃতি ও পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। সে চায় ধরণিও তাকে যেন জড়িয়ে ধরে রাখে। তাকে যেন যেতে না দেয়। প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মধ্য দিয়ে সুভার এই মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে।
(গ) কাব্যের বাবা-মা’র সঙ্গে ‘সুভা’ গল্পের বাবা-মা’র মনোভাব ও পদক্ষেপ গ্রহণে বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
সমাজে স্বাভাবিক মানুষের সঙ্গে কিছু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষও দেখা যায়। তারা শারীরিক অক্ষমতার কারণে অনেক সময় অবহেলার শিকার হয়। অথচ তারাও মানুষ। সবার সহযোগিতা, আদর-যত্ন পেলে তারাও সমাজে অবদান রাখতে পারে। তাদের জীবন আরও সুন্দর হতে পারে।
উদ্দীপকের কাব্য বাষ্প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও তার মা মিসেস শরীফা একটুও ঘাবড়ালেন না; স্বামীকেও বোঝালেন। বাবা-মায়ের পরম স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্নে বেড়ে উঠতে লাগল কাব্য। অন্যদিকে ‘সুভা’ গল্পে বাবা তাকে কিছুটা ভালোবাসলেও মা সুভাকে নিজের ত্রুটি হিসেবে দেখেন; তাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক বিবেচনা করে তার প্রতি খুবই বিরক্ত হন। বয়স বাড়তে শুরু করলে মা-বাবা তাকে বোঝা হিসেবে মনে করেন। লোকের নিন্দা থেকে বাঁচার জন্য পিতা সুভাকে নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তাই বলা যায়, কাব্যের বাবা-মা’র সাথে ‘সুভা’ গল্পের বাবা-মা’র বৈসাদৃশ্য হলো প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি তাদের আচরণ ও মনোভাবে।
(ঘ) উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিচর্যা পেলে কাব্যের মতো সুভা সমাজের একজন হয়ে উঠতে পারত।
আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়। তারা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ তারাও কোনো- না-কোনো প্রতিভা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করা হলে, পরম আদর-যত্নে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া হলে দেশ ও জাতির উন্নয়নে তারা অবদান রাখতে পারে।
উদ্দীপকের কাব্য একজন বাষ্প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও বাবা-মায়ের কাছ থেকে পরম স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্ন পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠেছে। কাগজে আঁকিবুকি দেখে মা তাকে নিয়ে আশান্বিত হন। তিনি বুঝে যান মুখে ভাষা না থাকলেও তুলির আঁচড়েই সে একদিন বিশ্ব জয় করবে। স্বামীর সাথে পরামর্শ করে ছেলের আঁকাআঁকির জন্য যা যা করা দরকার সব করলেন। ফলে সে তার প্রতিভা সবাইকে দেখিয়ে দেয়। দেশে-বিদেশে প্রদর্শনী হয় তার ছবির, বিক্রি হয় বহু মূল্যে।
সুভা’ গল্পে সুভা একজন বাষ্প্রতিবন্ধী। তবে তার চারপাশের সবকিছুই উপলব্ধি করতে পারে। বাষ্প্রতিবন্ধী সুভা মা, পাড়া- প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের মানসিক সহায়তা বা সহানুভূতি পায়নি। অথচ সে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে পেরেছে। প্রতাপের কথায় সে কষ্টও পেয়েছে। বাবা-মা কলকাতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে সে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছে। গাভীকে সে নিজের বেদনার সঙ্গী করেছে। পরিবার, সমাজ থেকে সে শুধু কষ্টই পেয়েছে। অনুপ্রেরণা পায়নি। কিন্তু পরিবার ও সমাজ থেকে উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিচর্যা পেলে কাব্যের মতো সুভা সমাজের একজন হয়ে উঠতে পারত। কেননা সব বোধ এবং অনুভূতি তার পরিপূর্ণ ছিল। তাই বলা যায়, প্রশ্নে প্রদত্ত মন্তব্যটি যথার্থ।