প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৩টি সংগীত

ছড়া গান: প্রিয় ফুল শাপলা

কথা: নজরুল ইসলাম বাবু

সুর: খোন্দকার নুরুল আলম

ছড়ার প্রতি আকর্ষণ মানুষের সহজাত এবং চিরন্তন। ছড়া বা ছড়ার উপাদানের সাথে আমাদের জীবন ঘনিষ্ঠ অনেক কিছুর মিল আছে যা শিশু মনকে খুব সহজেই আকৃষ্ট করে। ছন্দ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ছড়ার সেই ছন্দকে যদি সুরে গাঁথা যায় তখন তার ছোঁয়ায় শিশুরা মনের আনন্দে উড়ে বেড়ায়। অনাবিল আনন্দে ভরে যায় তার মন। বিশিষ্ট গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু এবং সুরকার খোন্দকার নুরুল আলম ছড়া গানে সেই ছোঁয়া আছে। এখানে শিক্ষার্থীদের গ্রহণ ও ধারণ ক্ষমতার কথা বিবেচনায় রেখেই ছোট শিশু উপযোগী ছড়া গানটি নির্বাচন করা হয়েছে। আমাদের মাতৃভাষা, জাতীয় পতাকা, জাতীয় ফল, ফুল, পশু, পাখি ও মাছের কথা বলা হয়েছে এখানে। গানটিকে আমরা দেশাত্মবোধক গান হিসেবেও বিবেচনা করতে পারি। গানটি শেখানোর পূর্বে যদি শিশুদেরকে আমাদের জাতীয় পতাকার রং, জাতীয় ফুলের নাম, ফলের নাম সম্পর্কে ধারণা দিই, তবে তারা আরও বেশি আগ্রহী হবে এবং তাদের জন্য গানের বাণী মনে রাখা সহজ হবে।

 গানটি কাহারবা তালে (৪+৪=৮ মাত্রা) গাওয়া হয়েছে। (ধা যে তে টে। না গে ধি না। ধা)। এই গানটি গাওয়ার সময়/পূর্বে উচ্চারণগুলো ঠিক আছে কিনা কা শুনে শুধরে নিতে হবে। এর উচ্চারণের বেলায় ঠোঁট দুটি মিলায়ে ‘ফ’ বলতে হবে। এ গানটি প্রথম শ্রেণির শিশুদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ গান ছাড়াও পছন্দ মত গান করানো সম্ভব।

ছড়া গান

কথা: নজরুল ইসলাম বাবু

সুর: খোন্দকার নুরুল আলম 

তাল: কাহার্‌বা

প্রিয় ফুল শাপলা ফুল

প্রিয় দেশ বাংলাদেশ।

প্রিয় ভাষা বাংলা ভাষা

মায়ের কথার মিষ্টি রেশ।।

 প্রিয় পাখি দোয়েল পাখি

প্রিয় সবুজ লাল,

আরো প্রিয় জষ্ঠী মাসের

সুবাসী কাঁঠাল।

মাঠে রাখালীয়া বাঁশি

ভোলায় যত দুঃখ ক্লেশ।।

প্রিয় নদী পদ্মা নদী

প্রিয় ইলিশ মাছ,

সুন্দর বনের রয়েল বেঙ্গল

আর সুন্দরী গাছ ।

চির সবুজ আমার দেশের রূপের যেন নেইকো শেষ।।

ছড়া গান: প্রজাপতি প্রজাপতি

কথা: কাজী নজরুল ইসলাম

সুর: কমল দাশগুপ্ত

 

কাজী নজরুল ইসলাম-প্রজাপতি! প্রজাপতি! গানটি রচনা করেছেন। কবি বিশ্ব জগতকে শিশুমন দিয়ে দেখে, পর্যবেক্ষণ করে গভীরভাবে অনুভব করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ। আছে লাল, নীল, সোনালী, রূপালী রঙ এর প্রজাপতি। যারা পাখা মেলে বনে বনে, পাতায় পাতায়, ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। ফুল থেকে মধু আহরণ করে ও মধু খায়। প্রজাপতির সাথে শিশুমন সবসময় উড়ে বেড়াতে চায়। বন্দী জীবন উপেক্ষা করে মুক্ত ভাবে ঘুরে বেড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করে। মনের আনন্দে প্রজাপতি যেমন রকমারী রঙের পাখা মেলে নেচে বেড়ায় কবির শিশুমনও তেমন নানা রঙের সঙ্গে একমত হতে চায়। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কমল দাশগুপ্তের সুরে গানটি কাহারবা তালে (৪+৪ = ৮ মাত্রা, ধা গে না তি । না ক ধি না । ধা) বিন্যাস করা হয়েছে।

ছড়া গান

কথা: কাজী নজরুল ইসলাম

সুর: কমল দাশগুপ্ত

তাল: কাহারবা 

প্রজাপতি! প্রজাপতি!

কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা,

টুকটুকে লাল-নীল ঝিলিমিলি আঁকা-বাঁকা।।

তুমি টুল টুলে বন-ফুলে মধু খাও

মোর বন্ধু হয়ে সেই মধু দাও

ওই পাখা দাও সোনালী-রুপালি পরাগ মাখা।।

মোর মন যেতে চায় না পাঠশালাতে

প্রজাপতি! তুমি নিয়ে যাও সাথী করে

তোমার সাথে।

তুমি হাওয়ায় নেচে নেচে যাও

আর তোমার মত মোরে আনন্দ দাও

এই জামা ভাল লাগে না

 দাও জামা ছবি-আঁকা।।

ছড়া গান: আমরা সবাই রাজা

কথা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 কাব্যগীতি সুধায় বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত একটি নাম-সে হলো রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যে এমন কোন দিক নাই যেখানে রবীন্দ্রনাথ স্পর্শ করেন নাই। তাঁর স্পর্শে স্বমহিমায় চিরভাস্বর হয়েছে কবিতা, গল্প, নাটক, গান, চিত্রশিল্প ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূজা, স্বদেশ, প্রেম ও প্রকৃতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গান রচনা করেছেন। তাঁর স্বদেশ পর্যায়ের এই গানটিতে শিশু মনের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ছোট-বড় ভেদাভেদের কথা ভুলে গিয়ে একই সূত্রে সবাইকে গাঁথা হয়েছে এখানে। দাস দাসত্বের ঊর্ধ্বে সকলকে একই মন্ত্রে দীক্ষিত করার প্রয়াস পেয়েছে গানটিতে। রাজাপ্রজা, ধনি-দরিদ্র, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সকলকে সমমানের মনে করেছেন। যার যার নিজস্ব ঢং-এ আলাদা ব্যক্তি সত্ত্বার গুরুত্ব দিয়ে রচিত হয়েছে গানটি।

 দ্রুত দাদরা তালে গানটি গাওয়া হয়েছে। প্রতি মাত্রায় বাঁয়াতে একটি করে আঘাত দিয়ে গানটির তাল রাখা হয়। গানটি গাইবার সময় উচ্চারণের প্রতি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রাজত্বে, স্বত্বে, দাসত্বে, অসত্বে ও আবর্তে ঠিক উচ্চারণ করতে হবে। এ শব্দগুলো উচ্চারণে জিহ্বার মাথায় জোর দিতে হবে। বাঁধা বলার সময় চন্দ্রবিন্দুর ঠিক উচ্চারণ করবে। এই গানের মধ্য দিয়ে সকলের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। সঠিক উচ্চারণে গাইলে গানের ভাবটিও যথাযথভাবে ফুটে উঠবে।

ছড়া গান

কথা ও সুর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তাল: দাদরা 

আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে

নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?

আমরা যা খুশি তাই করি,

তবু তাঁর খুশিতেই চরি,

 আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে

নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?

রাজা সবারে দেন মান,

 সে মান আপনি ফিরে পান,

মোদের খাটো করে রাখে নি কেউ কোনো অসত্যে

নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?

আমরা চলব আপন মতে,

 শেষে মিলব তাঁরি পথে,

 মোরা মরব না কেউ বিফলতার বিষম আবর্তে

নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?

বিশ্বসংগীত: আমরা করব জয়

বাংলায় শিশুদের উপযোগী বা শিশুকেন্দ্রিক অনেক গান আছে যার দ্বারা সকল বয়সের মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়। তেমনি পৃথিবীর শিশুদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি গান বহুল প্রচলিত, যে গানে বিশ্বের সকল ভাষাভাষির শিশুরা অনুপ্রাণিত হয় এবং যে গানের বাংলা হলো “আমরা করব জয়”। গানটি আফ্রিকান কৃতদাসের মধ্যে প্রচলিত ছিল। পিট সিগার গানটি পুনর্বার Compose করেন। বঙ্গানুবাদ করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। বিশ্বায়নের এই যুগে সমগ্র পৃথিবীটা যেন একই সূত্রে গাঁথা এবং এই পৃথিবীর সকল শিশুই যেন এক এবং অভিন্ন। তারা একত্র হয়ে তাদের সমস্ত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করার চেষ্টা করবে। তারা এখন আর একা নয় কোন কিছুতেই যেন তারা ভয় পায় না। সবকিছুই যেন তারা একদিন অতিক্রম করবে। শিশুদের একাত্ম হতে উদ্বুদ্ধ করে এই গানটি রচিত। এতে শিশুর স্বদেশ ভূমিই নয়। সমগ্র পৃথিবীর শিশুদের সাথে তাদের আত্মিক মিলের সুযোগ আছে। মূল বিশ্বসংগীতের (We shall overcome) ধারা বজায় রেখে গানটি গাওয়া হয়। গানটি বাংলায় কাহারবা তালে ধীর লয়ে গাওয়া হয়েছে।

বিশ্বসংগীত

আমরা করব জয়

আমরা করব জয় একদিন

ওহো বুকের গভীরে আমরা জেনেছি

যে আমরা করব জয় একদিন ॥

আমরা নই একা

আমরা নই একা আজকে

ওহো বুকের গভীরে আমরা জেনেছি

যে আমরা করব জয় একদিন ॥

আমাদের নেই কোন ভয়

আমাদের নেই কোনো ভয় আজকে

ওহো বুকের গভীরে আমরা জেনেছি

যে আমরা করব জয় একদিন ।।

একুশে ফেব্রুয়ারির গান

কথা: আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
সুর: শহীদ আলতাফ

একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে আমাদের সবারই কিছু ধারণা আছে। এই দিনটি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।

 আমাদের জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে উনিশশো বাহান্ন সালের এই দিনে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার-রা ঢাকার রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগেই বাংলাভাষা রাষ্ট্রভাষার সম্মান আদায় করে নিতে পেরেছিল। সেদিনের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহীনদের দেশপ্রেম ও তার চেতনাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দিকে। পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাভাষাপ্রেমী ভাইদের রক্তে রাঙা এই একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতি বছর আমাদের কাছে নতুন হয়ে ফিরে আসে স্বজন হারানোর শোক বহন করে। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার অমর স্মৃতি হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানোগানটি আমাদের খুব পরিচিত ও জনপ্রিয়।

 মাতৃভাষার আকৃতি নিয়ে আরো অনেক জনপ্রিয় গান আছে। মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলাভাষা’, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়, ও বাঙ্গালি, তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলিএ গানগুলো খুব উল্লেখযোগ্য। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর ফলে একুশের গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি বেড়েছে অনেক। ভাষাপ্রেমীদের আত্মাহুতির ধারায় বিশ্বের সব মাতৃভাষার স্বীকৃতি বাঙ্গালির জন্য এক অপূর্ব গৌরব বয়ে এনেছে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর একটি কবিতার কয়েকটি ছত্র নিয়ে রচিত এই গান। কবিতাটির আরো কিছুটা অংশ সুরে গাওয়া হয়। তবে এখানে যে কটি চরণ আছে, একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরী ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সেটুকুই ফিরে ফিরে গাওয়া হয়। এ গানে সুর দিয়েছিলেন আলতাফ মাহমুদ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর নির্যাতনে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আমাদের জাতীয় সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই গানটি প্রতিটি দেশবাসীর জানা প্রয়োজন। এই গানের বাণী ও সুরের বেদনায় প্লাবিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি। সুরের গতি ধীর ও সরল। উদারা সপ্তকের নি, ধা আর পা স্বর এই গানে গাম্ভীর্য এনেছে। শেষ ছত্রের আমি কি ভুলিতে পারিকথাটি বেদনার তীব্রতায় ভরে উঠেছে তারা সপ্তকের সাস্বর প্রয়োগে গানটি ৩+৩=৬ মাত্রা দাদরা তালে নিবদ্ধ। তবে তালটি ধীর ভাবে গানের চলনে মিশে থাকে, বেদনার মূল ভাবটিকে ছাপিয়ে যায় না। ধন ধান্য পুষ্প ভরাগানটির মতো এ গানটিতেও বেশির ভাগ সময় শুধু তাল রাখার জন্য বাঁয়াতে একটি করে আঘাত করা হয় ফেব্রুয়ারিউচ্চারণে ইংরেজি ‘F’- এর উচ্চারণ বজায় রাখা হয়। রাঙানোশব্দটিতে ‘রাংগানোনা বলে ‘ঙ’ উচ্চারণ করতে হবে। গানের বাণিতে ‘, ‘‘, ‘ড়ধ্বনিগুলো রয়েছে-এসব ধ্বনি উচ্চারণে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সর্বসাধারণের প্রিয় এই গানটি শুদ্ধ উচ্চারণে মূল ভাব বজায় রেখে গাইতে হবে।.

একুশে ফেব্রুয়ারির গান

 

কথা: আবদুল গাফফার চৌধুরী

সুর: শহীদ আলতাফ মাহমুদ

তাল: দাদরা 

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি।।

ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি।।

আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি

 

আমি কি ভুলিতে পারি।।

জাতীয় সংগীত

কথা ও সুরঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকু

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্বকালে অর্থাৎ তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসিগানটি নানা কারণেই বাঙালির কাছে খুব আদৃত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশপ্রেম ও গণজাগরণমূলক সভা-সমাবেশ ও মিছিলে বাঙালি কণ্ঠে তুলে নিয়েছিল এই গান। রবীন্দ্রনাথের এই গানটিতে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনার পাশাপাশি রয়েছে সেই অপূর্ব রূপময়তায় বাঙালির মুগ্ধতা ও দেশপ্রেমের এক আবেগঘন প্রকাশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এ গানেই বাঙালি তার চেতনার ভাষা খুঁজে পেয়েছিল, পেয়েছিল স্বদেশ-মুক্তির প্রেরণা। স্বাধীন বাংলাদেশে তাই এই গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হলো। সুরের ক্ষেত্রে একটি বৈশিষ্ট্য খুব সহজেই এখানে লক্ষ করা যায়। শিলাইদহ এলাকার ডাকঘরের গগন হরকরা বাউল গানের সুরে আমি কোথায় পাব তারে/আমার মনের মানুষ যে রেগানটি গেয়ে চিঠি বিলি করতেন। বাউলের এই সহজ সুরে মুগ্ধ হলেন রবীন্দ্রনাথ। সুরের এই আদর্শকে তিনি গ্রহণ করলেন তাঁর দেশাত্মবোধক গানটিতে।

বাংলার প্রকৃতি ও মানবমনের নিবিড় সম্পর্কটি বাউলের সুরে যেন চিত্ররূপময়তা পেয়েছে। স্বদেশ পর্যায়ের গানকে আবহমান সংগীতে গেঁথে দেবার মধ্যে যে এক ধরণের গভীর লোকসংলগ্নতার মাত্রা থাকেসেটি এখানে উপলব্ধি করা যায়। সযত্ন শ্রদ্ধায় জাতীয় সংগীত গাইতে হয়শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে। স্বরলিপি অনুযায়ী গানটি একটানা গেয়ে শেষ করতে হবে। ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো লাইন দুবার গাওয়া যাবে না। স্বরলিপিতে যেখানে দুবার গাইবার নির্দেশ আছেশুধু সেটুকুই দুবার গাইতে হবে। জাতীয় সংগীতে রাণী ভুল করা একেবারেই অনুচিত । তাই এই গানটি প্রথমেই মুখস্থ করে নিতে হবে।

উচ্চারণের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্নবান হতে হবে। ‘বাঁশি‘ ‘আঁচল’ শব্দের চন্দ্রবিন্দুর উচ্চারণ, ‘ফাগুনের’ ‘ফ‘ এবং ‘দেখেছি’বিছায়েছ’ বলতে ‘ছ’-য়ের উচ্চারণে সতর্ক থাকতে হবে। এসব শব্দ উচ্চারণের বিষয়টি আগেও অন্যান্য গানের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

৩ + ৩ = ৬ মাত্রার দাদরা তালে গানটি নিবদ্ধ। এর লয় হবে মধ্যঅর্থাৎ খুব ঢিমা বা বেশি দ্রুত হবে না। সঠিক লয়ে গীত হলেই গানের সৌন্দর্যটি প্রকাশ পাবে। বাউল সুরের গান বলে এর সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত।

জাতীয় সংগীত

কথা ও সুরঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুর: গগন হরকরার গান অবলম্বনে

তাল: দাদরা 

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ওমা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,

মরি হায়, হায়রে

ওমা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি আমি কি দেখেছি মধুর হাসি ॥

কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ কী মায়া গো

কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,

মরি হায়, হায়রে

মা, তোর বদন খানি মলিন হলে,

ওমা, আমি নয়ন জলে ভাসি ॥

দেশাত্মবোধক গান: ধন ধান্য পুষ্প ভরা

কথা ও সুর: দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

বাংলা কাব্যগীতির ধারায় সুপরিচিত একটি নাম-কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। দেশাত্মবোধ, প্রেম ও হাস্যরস এ তিনটি ছিল তাঁর গানের তিন প্রধান বিষয়। তবে দেশাত্মবোধক গানে তাঁর কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়।

ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা একটি বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গান। এছাড়া বঙ্গ আমার! জননী আমার!’ ‘যেদিন সুনীল জলধি হইতে’, ‘আজি গো তোমার চরণে জননী’, ‘আবার তোরা মানুষ হ বাঙালির সুপরিচিত এই গানগুলোতেও তাঁর স্বদেশ প্রেমের উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে এই গানটি দেশের জাতীয়গীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। গানটিতে জন্মধন্যতাবোধ, দেশের নিসর্গশোভা ও দেশগৌরবের কথা বর্ণিত হয়েছে। বাংলাদেশের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য বাঙালির অন্তরকে প্রভাবিত করে। ফুল-ফল, স্নিগ্ধ নদী, ধূম্র পাহাড় ও মাঠ-ঘাটের রূপময়তায় এক সুন্দর স্বপ্নাবেশ সৃষ্টি হয়। প্রাণে উচ্ছ্বসিত। হয়ে ওঠে গান সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।গানের শেষ কথাটি হলো, বাঙালির ঘরের মতো ভাইয়ের মায়ের এত স্নেহ পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। গানটি গাইতে গাইতে জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসায় অন্তর পূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই গানের বৈশিষ্ট্য।

গীতিকার এবং সুরকার উভয় ক্ষেত্রেই বিজেন্দ্রলাল রায় তাঁর প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। সুরের দিক থেকে ধনধান্য পুষ্প ভরা‘ গানটি গুরুগম্ভীর। সুরের চলনছন্দ ও স্বরবিরামে পাশ্চাত্য সংগীতের ধীর ও উপাত্ত ভাব আছে। তবে তা রচিত হয়েছে ভারতীয় সংগীতের কেদারা ঠাটে। এতে বিকৃত স্বর আছে দুটি-কোমল নি (গা) ও কড়ি মা (হ্মা)। তার সপ্তকের দুটি স্বর ব্যবহৃত হয়েছে একটি সা‘, অপরটি রে

৩+৩ = ৬ মাত্রার এই গানটির গতি ধীর। সাধারণত প্রতি মাত্রায় টোকা না দিয়ে বাঁয়াতে একটি করে আঘাত দিয়ে গানের তাল রাখা হয়।

দীর্ঘ গানটির উচ্চারণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দেশ‘ কে দ্যাশ‘ আর ধান্য‘ কে ‘খাইনা বা ‘দাইন্য’ বলা যাবে না। স্মৃতি‘ বলতে হবে ‘স্মৃতি। ‘খুঁজে’ শব্দটিতে চন্দ্রবিন্দু উচ্চারণ করতে হবে। উ’-য়ে শূণ্য ‘ড়া-য়ের ক্ষেত্রে সচেতন হয়ে তড়িৎ‘ বা পাহাড়‘ উচ্চারণে জিভের পাতার উল্টো দিক দিয়ে উপরের মাড়িতে আঘাত করে ‘ড়’ বলতে হবে। ফুল‘ উচ্চারণে অবশ্যই দুটো ঠোঁট মিলিয়ে এই ‘ বলতে হবে।। চ’, ‘হ’, ‘জ’, ‘‘ উচ্চারণের সময়ে জিভ দিয়ে উপরের দাঁতের মাড়ি ভালো করে চেপে বাতাসের পথ আটকে নিতে হবে প্রথমে। এছাড়া গানটিতে ‘, ‘‘, ‘‘, ‘‘ মহাপ্রাণ ধ্বনিগুলো আছে। এগুলো যেন কিছুতেই ‘দ‘, ‘‘, ‘‘, ‘‘-য়ের মতো না শোনায়। বক্ষে‘ উচ্চারণ হবে বোক্‌খে

দেশাত্মবোধক গান

কথা ও সুর: দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

তাল: দাদরা

ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা

তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা

ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা 

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি 
ও সে, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি সে যে আমার জন্মভূমি।

চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা, কোথায় উজল এমন ধারা

কোথায় এমন খেলে তড়িৎ এমন কালো মেঘে

ও তার পাখির ডাকে ঘুমিয়ে উঠে পাখির ডাকে জাগেে

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

 ও সে, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি 

সে যে আমার জন্মভূমি।

এত স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়

কোথায় এমন  হরিত ক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে 

এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় 

বাতাস কাহার দেশে

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

ও সে, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি

সে যে আমার জন্মভূমি।

পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখি, কুঞ্জে কুঞ্জে গাছে পাখি

গুঞ্জরিয়া আসে অলি পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে

তারা ফুলের উপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়েে

এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবে নাকো তুমি

ও সে, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি

সে যে আমার জন্মভূমি।

 

ভায়ের মায়ের এত স্নেহ, কোথায় গেলে পাবে কেহ

ওমা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি

আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি

এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবে নাকো তুমি

ও সে, সকর দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি

সে যে আমার জন্মভূমি।

 

451 Views
Leave A Reply

Your email address will not be published.