এসএসসি ২০২২ এর পৌরনীতি ও নাগরিকতা বিষয়ের অ্যাসাইনমেন্টের উত্তর (৫ম সপ্তাহ)

পৌরনীতি ও নাগরিকতার ধারণাঃ

পৌরনীতি ও নাগরিকতা দুটি প্রত্যয়ের সমষ্টি। কিন্তু বিষয়বস্তু একই। পৌরনীতি শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Civics। Civics শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Civis এবং Civitas থেকে। Civis অর্থ হল নাগরিক এবং Civitas অর্থ হল নগর রাষ্ট্র। অর্থাৎ Civics মানে সে শাস্ত্র যা নগররাষ্ট্র বা রাষ্ট্রে বসবাসকারী নাগরিকদের নিয়ে আলোচনা করে। পৌরনীতি ও নাগরিকতার বিষয়ে রাষ্ট্রের আলোচনায় নাগরিক আরও বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

পৌরনীতি শাস্ত্রের যাত্রা শুরু মূলত প্রাচীন গ্রীসে। প্রাচীন গ্রীসে নাগরিক ও নগররাষ্ট পরষ্পর অবিচ্ছেদ্য ছিল। তৎকালীন গ্রীসের সকল জনসাধারণ নাগরিক ছিলেন না। কেবল যারা রাষ্ট্রের শাসনকার্যে অংশ নিতেন তারাই নাগরিকত্ব লাভ করেন। তাই Civics নামক বিষয়টি ছিল কেবল রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্পর্কিত জ্ঞানের সমষ্টি। নগররাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সর্ম্পক, কার্যাবলি, নাগরিকের সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি আলোচনা হতো।

এফ আই গ্লাউড বলেন, “ যে সকল অভ্যাস, প্রতিষ্ঠান, কার্যাবলি ও চেতনার দ্বারা মানুষ রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে এবং অধিকার ভোগ করতে পারে, তার অধ্যয়নই পৌরনীতি।”

ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ই. এম. হোয়াইট যথার্থই বলেছেন, পেীরনীতি হলো জ্ঞানের সেই মূল্যবান শাখা, যা নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবতার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।

বিষয়বস্তুর দৃষ্টিতে পৌরনীতিকে দুটি অর্থে আলোচনা করা যায়। ব্যাপক অর্থে, পৌরনীতি নাগরিকতার সাথে জড়িত সকল বিষয়ে আলোচনা করে। যেমন- অধিকার ও কর্তব্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিকতার স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়, নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সংকীর্ণ অর্থে, অধিকার ও কর্তব্য পৌরনীতির বিষয়বস্তু।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলতে পারি, নাগরিক, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের আচরণ ও কার্যাবলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যে বিষয়টি আদর্শ নাগরিক জীবন সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে, তাকে ‘পৌরনীতি ও নাগরিকতা’ বলে।

পরিবারের কার্যাবলিঃ

পরিবার এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে মানুষ তার প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করে থাকে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের গুরত্ব অপরিসীম। পরিবারের কার্যাবলির তালিকা নিন্মে দেওয়া হলো-

ক.  জৈবিক কাজ: একজন পুরুষ ও একজন মহিলা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলেই সন্তান জন্ম গ্রহণ করে থাকে  এবং সে সন্তান পরিবারের মধ্যে লালিত-পালিত হয়। সমাজে সন্তান প্রজননের একমাত্র স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে শিশু স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত সেবা ও প্রতিপালনের কাজ পরিবার করে থাকে। পরিবারের এই ধরণের কাজ হলো জৈবিক কাজ।

২. শিক্ষামূলক কাজ: শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পাদিত হয় পরিবারেই। পরিবারকে বলা হয় ‘প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র’। পরিবারের তত্ত্বাবধানেই শিশু শিক্ষা জীবনে প্রবেশ করে। এছাড়াও শিশুর সততা, শিষ্টাচার, উদারতা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলির শিক্ষাপরিবার থেকে লাভ করে।

গ. অর্থনৈতিক কাজ: পরিবারের সদস্যদের খাদ্র, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি চাহিদা পূরণের দায়িত্ব পরিবারের। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্নভাবে অর্থ উপার্জনের মা্ধ্যমে এসব চাহিদা মিটিয়ে থাকে। পরিবারকে কেন্দ্র করে কুটির শিল্প, মৎস্য চাষ, কৃষিকাজ, পশু পালন ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজ সম্পাদিত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজের যায়গাগুলো অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়েছে এবং নতুন নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে। তবে আজও পরিবার আমাদের সকল অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করছে।

ঘ. রাজনৈতিক কাজ: শিশুরা পরিবারের মাধ্যমেই দায়িত্ব, নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রভৃতি শিক্ষা লাভ করে, যা সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে নাগরিকের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে সকল জ্ঞান শিশুরা পরিবার থেকেই অর্জন করে। তাদের এই শিক্ষা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় জীবনে কাজে লাগে। এছাড়াও পরিবারে বড়দের রাজনৈতিক আলোচনা শুনে ও সে আলোচনায় অংশগ্রহণ করে শিশুরা দেশের রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে।

ঙ. মনস্তাত্ত্বিক কাজ: শিশু তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে স্নেহ- ভালোবাসা পায় তা তার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে । শিশুরা বড় হলে তারও স্নেহ-ভালবাসার অধিকারী হয়। তাই পরিবার হল মানসিক সাধনের অনন্য প্রতিষ্ঠান। আবার দু:খ কষ্টে একজনের সাথে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ভাগাভাগি করে প্রশান্তি লাভ করে। তাছাড়াও পরিবার থেকে শিশু উদারতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা প্রভৃতি গুণগুলো শিক্ষা লাভ করে, যা তাদের মাসনিক দিককে সমৃদ্ধ করে।

চ. বিনোদমূলক কাজ: এক সময় ছিল পরিবারই ছিল অবকাশ ও চিত্তবিনোদনের একমাত্র কেন্দ্র। মানুষ সারাদিন কাজ শেষে ঘরে ফিরে পরিবার-পরিজনদের সাথে গল্প-গুজব, খেলাধুলা, গান-বাজনা ইত্যাদি করে অবসর বিনোদন করত। বর্তমানে রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা, নাটক, থিয়েটার, বইপত্র ইত্যাদির মাধ্যমে পারিবারিক বিনোদন করা হয়।

অতত্রব বলা যায়, পরিবার হলো আদি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। পরিবারের মাধ্যমেই একটি শিশু যথার্থ জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়ে সুনাগরিক হয়ে উঠে। তাই এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অনন্য।  

সমাজ সম্পর্কে ধারণা:

সমাজ বলতে মূলত এমন এক ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে একাধিক চরিত্র একত্রে কিছু নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করে একত্রে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলে। মানুষের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি একত্র হয়ে লিখিত কিংবা অলিখিত নিয়ম-কানুন তৈরি করে; এরকম একত্র বসবাসের অবস্থাকে সমাজ বলে।

সমাজ একটা অমূর্ত ধারণা । সমাজের কোন নির্দিষ্ট সীমানা নেই । সমাজ ছোট হতে পারে আবার বড়ও হতে পারে । এমনকি বিশ্বব্যাপীও হতে পারে । যেমন , রেডক্রস সমাজ ।

সমাজবিজ্ঞানী গিডিংস এর মতে, “ সমাজ বলতে আমরা সেই জনসাধারণকে বুঝি যারা সংঘবদ্ধভাবে কোনো সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মিলিত হয়েছে।”

অধ্যাপক আর , এম , ম্যাকাইভার তার সমাজ নামক গ্রন্থে সমাজের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন , ‘ আমাদের সামাজিক সম্পর্কে জটিল জালই সমাজ।’

অতএব বলা যায়, যখন কতিপয় লোক তাদের আশা -আকাঙ্ক্ষা , ধ্যান-ধারণা বাস্তবায়ন ও নিজের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে একত্রিত হয় ও একটি সংঘবদ্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুস্পষ্ট আবাস্থল গড়ে তোলে তখন তাকে সমাজ বলে।

আধুনিক রাষ্ট্রের ভূমিকা

রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের মানুষ কোনো না কোনো রাষ্ট্রে বসবাস করে। আমাদের এই পৃথিবীতে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০ টি রাষ্ট্র আছে। প্রতিটি রাষ্ট্রেরই আছে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং জনসংখ্যা। এ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আরও আছে সরকার এবং সার্বভৌমত্ব। মূলত এগুলো ছাড়া কোনো রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না।

অধ্যাপক গার্নার বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী, সুসংগঠিত সরকারের প্রতি স্বভাবজাতভাবে আনুগত্যশীল, বহিঃশত্রুর নিয়ন্ত্রণ হতে মুক্ত স্বাধীন জনসমষ্টিকে রাষ্ট্র বলে।’

নাগরিক অধিকার একরকমের অধিকারের শ্রেণী যা সরকার, সামাজিক সংগঠন, ও বেসরকারি ব্যক্তির দ্বারা লঙ্ঘনের থেকে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করে। একজন যাতে বৈষম্য বা নিপীড়ন ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রের বেসামরিক ও রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণ করতে পারে তা নিশ্চিত করে।

নাগরিক অধিকার অন্তর্ভুক্ত করে জনগণের শারীরিক ও মানসিক সততা, জীবন, ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; জাতি, লিঙ্গ, জাতীয় মূল, রঙ, বয়স, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, জাতিভুক্তি, ধর্ম, বা অক্ষমতার মতো ভিত্তিতে বৈষম্য থেকে সুরক্ষা এবং একক অধিকার যেমন গোপনীয়তা এবং চিন্তার স্বাধীনতা, বাকশক্তি, ধর্ম, প্রেস, সমাবেশ, এবং আন্দোলনের স্বাধীনতা থেকে সুরক্ষা।

সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তার অভিন্নতা আধুনিক রাষ্ট্রের উথ্থানে ব্যাপকবিস্তারী ভূমিকা রেখেছে। একনায়কতান্ত্রিক সময়কাল থেকেই রাষ্ট্রের সংগঠন বহুলাংশে জাতীয়তা নির্ভর। একথা স্পষ্ট হওয়া দরকার যে জাতীয় রাষ্ট্র আর জাতি-রাষ্ট্র এক বিষয় নয়। এমন কি নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ঐক্য সবচেয়ে বেশি এমন সমাজেও রাষ্ট্র ও জাতির বৈশিষ্ট্য সমভাবে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে না। ফলে প্রায়ক্ষেত্রেই ষেয়ার্ড সিম্বল ও জাতীয় পরিচয়ের উপর জোর দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র জাতীয়বাদের প্রচার ও প্রসারে কাজ করে।

রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক:

প্রাচীনকালে রাষ্ট্র ও সরকারের কোনো পার্থক্য করা হতো না। ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই বলতেন, আমিই রাষ্ট্র। আধুনিককালে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে, নিন্মে আলোচনা করা হলো-

ক. গঠনগত:  জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখন্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব এ চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। সরকার উক্ত চারটি উপাদোনের মধ্যে একটি অন্যতম উপাদান, যার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।

খ. জনসমষ্টি: রাষ্ট গঠিত হয় দেশের সব জনগণ নিয়ে। আর সরকার গঠিত হয় আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিয়ে।

গ. স্থায়িত্ব: রাষ্ট্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সরকার অস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল। জনগণের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এবং রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে সরকার পবিবর্তিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের পরিবর্তন হয় না। উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার কিন্তু রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ঘ. প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য: বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অভিন্ন। কিন্তু সরকারের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন। যেমন- বাংলাদেশে রয়েছে সংসদীয় সরকার, আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার।

ঙ. সার্বভৌমত্ব: রাষ্ট্র সার্বভৌম বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। সরকার সার্বভৌম ক্ষমতার বাস্তবায়নকারী মাত্র।

চ. ধারণা: রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা। রাষ্ট্রকে দেখা যায় না, কল্পনা বা অনুধাবন করা যায়। কিন্তু সরকার মূর্ত। কারণ, যাদের নিয়ে সরকার গঠিত হয়, তাদের দেখা যায়।

উপরোক্ত আলোজনা থেকে বলা যায়, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একটিকে ছাড়া অন্যটির কথা কণ্পনা করা যায় না। রাষ্ট্রকে পরিচালনার জন্যই সরকার গঠিত হয়।

1,057 Views
Print Friendly, PDF & Email
Leave A Reply

Your email address will not be published.