এসএসসি পৌরনীতি ও নাগরিকতা অ্যাসাইনমেন্ট উত্তর ২০২১

উত্তরঃ

(ক)

পরিবারঃ সমাজ স্বীকৃত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রীর একত্রে বসবাস করাকে পরিবার বলে। অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এক বা একাধিক পুরুষ ও মহিলা, তাদের সন্তানাদি, পিতামাতা এবং অন্যান্য পরিজন নিয়ে যে সংগঠন গড়ে উঠে- তাকে পরিবার বলে । ম্যাকাইভারের মতে, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের জন্য সংগঠিত ক্ষুদ্র বর্গকে পরিবার বলে । আমাদের দেশে সাধারণত মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি ও দাদা-দাদির সমন্বয়ে পরিবার গড়ে উঠে। তবে শুধু একজন মহিলা বা একজন পুরুষকে পরিবার বলা হয়। মূলত পরিবার হলো স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গঠিত ক্ষুদ্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার মতে, “যৌন সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সন্তান-সন্ততির জন্মদান এবং লালন-পালনের উদ্দেশ্যে যে সংগঠন গড়ে ওঠে তাকে পরিবার বলে।”

Encyclopedia Americana গ্রন্থে বলা হয়েছে, “পরিবার পথটি সাধারণত কিছু ব্যক্তির সমষ্টিকে বোঝায়, যারা জন্ম এবং বিবাহসূত্রে একইক আবাসগৃহে বসবাস করে। সাধারণত দেখা যায়, পরিবার পথটি পূর্বপুরুষের ধারণা পর্যন্ত গ্রহণ করে।”

পরিবারের ধরণঃ পরিবার একটি ক্ষুদ্র সামাজিক বর্গ। পরিবার বলতে সেই সামাজিক ক্ষুদ্র সংস্থাকে বুঝায় যেখানে এক বা একাধিক পুরুষ তার বা তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও অন্যান্য পরিজন নিয়ে একত্রে বসবাস করে।  

বংশ পরিচয় ও নিয়ন্ত্রণের ধারা বংশ পরিচয় ও নিয়ন্ত্রণের ধারার ভিত্তিতে পরিবারকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা-

(ক) পিতৃতান্ত্রিক

(খ) মাতৃতান্ত্রিক পরিবার।

(ক) পিতৃতান্ত্রিক পরিবার; যখন পিতা পরিবারের কর্তা অথবা পিতার দিক হতে পরিবার পরিচিত হয় তখন তাকে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার বলে। সমাজবিজ্ঞানী হেনরি মেইন এই পরিবার ব্যবস্থাকে আদি ও অকৃত্রিম বলে উল্লেখ করেছেন।

(খ) মাতৃতান্ত্রিক পরিবার : যখন মাতার দিক হতে বংশ পরিচয় দেওয়া হয় এবং মাতা পরিবারের প্রধান হন তখন তাকে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার বলে। প্রাচীনকালে মিশর ও তিব্বতে এই ধরনের পরিবার-ব্যবস্থা বিরাজমান ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ ও আসামের খাসিয়া গারো নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের পরিবার দেখা যায়।

বিবাহ প্রথা বিবাহ প্রথার উপর ভিত্তি করে পরিবারকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যেমন-

(ক) একপত্নীক – যদি একজন স্বামী একজন স্ত্রী গ্রহণ করে পরিবার গঠন করে তবে তাকে একপত্নীক পরিবার বলে। এটি বর্তমান কালের প্রচলিত পরিবারব্যবস্থা।

 (খ) বহুপত্নীক– যখন একজন পুরুষ একাধিক স্ত্রী বিবাহ করে পরিবার গঠন করে তখন তাকে বহুপত্নীক পরিবার বলে। অর্থনৈতিক কারণে এ ধরনের পরিবারব্যবস্থা কমে যাচ্ছে।

(গ) বহুপতি পরিবার– যখন একজন স্ত্রী একের অধিক স্বামী গ্রহণ করে পরিবার গঠন করে তখন তাকে বহুপতি পরিবার বলে। হিন্দু ধর্মে মহাভারতে পঞ্চ পান্ডবের এক স্ত্রী দ্রৌপদির কথা উল্লেখ আছে।

পারিবারিক কাঠামো ও আকৃতির ভিত্তিতে পরিবারকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।

ক) একক পরিবার: যখন স্বামী-স্ত্রী তাদের উপর নির্ভরশীল সন্তান-সন্ততি নিয়ে পরিবার গঠন করে তখন তাকে একক পরিবার বলে।

(খ) যৌথ পরিবার: যে পরিবারে পিতামাতা তাদের নিজেদের সন্তান-সন্ততি এবং সন্তান-সন্ততিগণের সন্তান-সন্ততি নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করে তাকে যৌথ পরিবার বলে।

(খ)

যৌথ পরিবার হ্রাস এবং একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণঃ আমরা জানি, দাদা-দাদী, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, ছেলে – মেয়ে ইত্যাদি নিয়ে গঠিত যৌথ পরিবার। আর একক পরিবার মা-বাবা ও ভাই বোন নিয়ে গঠিত হয়। বর্তমানে কালের পরিক্রমায় যৌথ পরিবার হ্রাস পেয়ে একক পরিবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর পেছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। যেমন :

(i) সীমিত অর্থনৈতিক যোগানদাতা : একটি যৌথ পরিবার অনেক মানুষ নিয়ে গঠিত, যার লোক সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ জন অথবা তার উর্ধ্বে থাকলেও অনেক যৌথ পরিবারে অর্থনৈতিক যোগানদাতা মাত্র ২ থেকে ৪ জন থাকেন আবার তাদের আয়ের পরিমাণও সমান না। এ অবস্থায় যৌথ পরিবার থেকে পরিবার চালনা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়। এমনকি তারা নিজের এবং নিজের স্ত্রী সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই যৌথ পরিবার ভেঙ্গে মা, বাবা, দাদা, দাদী অন্যান্য সদস্যদের ছেড়ে একক পরিবার গঠনের চিন্তা করেন।

(ii) ব্যক্তি স্বার্থপরতা : যৌথ পরিবারের অর্থনৈতিক যোগানদাতা ব্যক্তিগণ অনেক সময় সবার সাথে মিলেমিশে যৌথ সম্পত্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি, যৌথ পরিবারের সদস্যদের অজান্তে নিজের, নিজের স্ত্রী অথবা সন্তানের নামে আলাদা সম্পত্তি গড়ে তুলেন।পরবর্তীতে তা পরিবারের অন্যান্য সদস্য গনের মধ্যে জানাজানি হলে ঝগড়ার হয় আর যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

(iii) কর্মজীবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি : পরিবারের কর্মজীবী সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কর্মজীবী সদস্যগণ চাকুরীর সুবাদে দীর্ঘদিন তাদের যৌথ পরিবারের বাহিরে দেশ – বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকতে হয় ৷ ফলশ্রুতিতে এক সময় তাদের মধ্যে যৌথ পরিবারে থাকার আগ্রহ কমে যায় বা তাদের সন্তানাদি মা-বাবার সাথে একক পরিবারে থাকতে অভ্যস্ত থাকায় তারা আর যৌথ পরিবারে ফিরে আসতে চায় না। ফলে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যেতে থাকে।

(iv) ব্যক্তিগত আধিপত্য বিস্তার : বর্তমান সমাজে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার অনুতেম প্রধান কারণ হলো ব্যক্তিগত আধিপত্য বিস্তার। পরিবারের প্রত্যেক ব্যক্তি চান পরিবারের সকল সদস্যকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ফলে একক পরিবার বৃদ্ধি পায়।

(গ)

আর্দশ পরিবারের কার্যাবলী :

পরিবারের কাজের দিকে খেয়াল করলেই বুঝা যায় পরিবারের কাজের গুরুত্ব কতখানি এবং পরিবার কি কাজ করে। পরিবার সাধারণত নিম্নলিখিত কাজগুলো করে।

(১) জৈবিক কাজ : পরিবারের অন্যতম কাজ সন্তান-সন্ততির জন্মদান এবং লালন-পালন। এই কাজটি পরিবারের ভিত্তি। কেননা যৌনতা, নারী-পুরুষের একে অপরের প্রতি আকর্ষণ ও সন্তান-বাৎসল্যের কারণেই মানুষ পরিবার গঠন করে। অনেক উন্নত দেশে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে লালন-পালনের নানা দায়িত্ব শিশু-সদন বা শিশুমঙ্গল প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোতে পালন করে থাকে। তবে পরিবারের মধ্যে যে আদর-স্নেহ ও মায়া-মমতায় শিশু বিকশিত হয় তার বিকল্প কিছুই সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

(২) শিক্ষামূলক কাজ : পরিবারকে সমাজ জীবনের শাশ্বত বিদ্যালয় বলা হয়। শিশুরা প্রথম শিক্ষা, বর্ণ পরিচয় ও যােগ-বিয়োগে পরিবারেই শিখে। এমনকি বড় হয়ে স্কুলে যে শিক্ষা দেওয়া হয় তাও পরিবারের নিয়ন্ত্রণে পূর্ণতা পায়। যেমন- পরিবারে মাতাপিতার সাহায্য ও সহযোগিতায় স্কুলের শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হয়। শুধু তাই নয় শিশুরা ধর্মীয় শিক্ষা, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদেরকে ভালবাসার শিক্ষা পরিবার থেকে লাভ করে। তাই শিশুশিক্ষার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্ডেন প্রভৃতি থাকলেও নৈতিক মূল্যবোধে ও মানবতাবোধের শিক্ষা পরিবারের মত অন্য কোন প্রতিষ্ঠান দিতে পারে না।

(৩) অর্থনৈতিক কাজ : অতীতে পরিবারের মধ্যেই অর্থনৈতিক কার্যাবলী সম্পাদিত হত। শিকার, মৎস্য চাষ ও সংগ্রহ, কুটির শিল্প প্রভৃতি কাজ পরিবারের সদস্যরা সম্পাদন করে জীবন ধারণ করত। তখন তাদের চাহিদা কম ছিল বলে পরিবার সদস্যদের সকল চাহিদা পূরণ করতে পারত। কিন্তু বর্তমানকালে অর্থনৈতিক চাহিদা বৃদ্ধি ও আয়ের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের ফলে পরিবারের সদস্যগণ অফিসআদালত, কলকারখানা ও নানাবিধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে আয় করে থাকে। তবে আজকাল আবার পরিবারমুখী আয়ের পথ উন্মোচিত হয়েছে। হাঁস-মুরগী পালন, মাছ চাষ, ফল ও ফুলের বাগান তৈরি, বাঁশ ও কাঠের কাজ, সেলাই ও বুনন কাজ করে পরিবারের সদস্যগণ আয় বাড়িয়ে সুখ-শান্তি ও স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি করছেন। পরিবারের সদস্যগণের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে অর্জিত আয় পরিবারের মধ্যে খরচ করে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কাজ করে।

(৪) মনস্তাত্ত্বিক কাজ: স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালবাসা ও আদর-যত্নে শিশুরা লালিত-পালিত হয় । পিতামাতার স্নেহে প্রতিপালিত শিশু সমাজে চলার পথে উদারতা, সহনশীলতা, দয়ামায়া প্রভৃতি মানবিক গুণাবলী দ্বারা পরিচালিত হয়। এর ফলে সুন্দর ও সুশৃংখল সমাজ গড়ে উঠে। পরিবারের এ কাজের কোন বিকল্প সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

(৫) নৈতিক কাজ : পরিবার তার সদস্যদেরকে নৈতিক শিক্ষা দান করে। সত্য কথা বলা, মিথ্যা না। বলা, পরচর্চা না করা প্রভৃতি নৈতিক কথা ও কাজের শিক্ষা শিশুরা পরিবার থেকেই অর্জন করে।

(৬) ধর্মীয় কাজ: ধর্মীয় নিয়মাবলী ও ধর্ম পালনের শিক্ষা পরিবার থেকেই অর্জিত হয়। সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য, নবী-রাসুল বা দেবদেবীর প্রতি ভক্তি শিশুরা মাতাপিতার নিকট থেকে অর্জন করে। যে পরিবারের মাতাপিতা ধার্মিক সেই পরিবারের সন্তান-সন্ততিরাও সাধারণত ধার্মিক হয়ে থাকে এবং বড় হয়ে ধর্ম পালন অব্যাহত রাখে।

(৭) অবকাশমূলক কাজ : পরিবার চিত্তবিনোদন বা অবকাশ ও মনোরঞ্জনমূলক কাজ করে থাকে। শিশুরা বাবা-মা এবং দাদা-দাদীর নিকট থেকে গল্প, কবিতা ও ছড়া শুনে আনন্দ লাভ করে। এক সময়ে পুঁথিপাঠ, রাজ-রাজরার গল্প-কাহিনী প্রভৃতির আসর জমিয়ে পরিবারের সদস্যরা আনন্দ লাভ করত। আজকাল সিনেমা, থিয়েটার, নাট্যমঞ্চ, ক্লাব, প্রভৃতি বিনােদনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তবুও বর্তমানকালে রেডিও, টেলিভিশন, টেপরেকর্ডার, ভি.সি.আর, পত্র-পত্রিকা প্রভৃতির মাধ্যমে পরিবারের সদস্যগণ পরিবারেই চিত্ত বিনোদনের কাজ করে থাকে।

(৮) সামাজিক কাজ : পরিবার সমাজ জীবনের অন্যতম একক এবং আদি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সমাজবিজ্ঞানীগণ পরিবারের সম্প্রসারণকে সমাজের উৎপত্তির কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরিবারের মাধ্যমে সামাজিক লেন-দেন, চাল-চলন, আচার-আচরণ ও সহযোগিতার শিক্ষা এবং বংশ মর্যাদা লাভ করা যায়। পারিবারিক জীবনের সংঘবদ্ধতা থেকেই মানুষ সমাজের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের শিক্ষালাভ করে। তাছাড়া পরিবারের নৈতিক শিক্ষা সামাজিক মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করে। পরিবার সামাজিকীকরণের ভূমিকা পালন করে সদস্যদেরকে সমাজে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলে।

(৯) রাজনৈতিক কাজ : পরিবার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বিশেষ। পরিবারে শাসক-শাসিতের সম্পর্ক বিরাজ করে। আনুগত্য ও নিয়মানুবর্তিতার প্রথম পাঠ আমরা পরিবারের মধ্যে লাভ করি। আদেশ দান ও আনুগত্যের শিক্ষা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় জীবনে পরিব্যাপ্ত হয় এবং আদর্শ রাষ্ট্রের অনুকূল পরিবেশ রচিত হয়। তাছাড়া পরিবারের বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শ ও চিন্তাধারা এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক আলােচনা থেকে তাদের উপর রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ দলের প্রতি সমর্থনের ক্ষেত্রে পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শ ও সমর্থনের প্রতিফলনও ঘটে।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, পরিবার অনেক কাজ করে থাকে এবং | কোন কাজের গুরুত্ব কম নয়। একটি আদর্শ পরিবার একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

612 Views
Print Friendly, PDF & Email
Leave A Reply

Your email address will not be published.